কোরান সূরা আলে-ইমরান আয়াত 199 তাফসীর

  1. Mokhtasar
  2. Ahsanul Bayan
  3. AbuBakr Zakaria
  4. Ibn Kathir
Surah Al Imran ayat 199 Bangla tafsir - তাফসীর ইবনে কাসীর - Tafsir Ahsanul Bayan তাফসীরে আহসানুল বায়ান - Tafsir Abu Bakr Zakaria bangla কিং ফাহাদ কুরআন প্রিন্টিং কমপ্লেক্স - বাংলা ভাষায় নোবেল কোরআনের অর্থের অনুবাদ উর্দু ভাষা ও ইংরেজি ভাষা & তাফসীর ইবনে কাসীর : সূরা আলে-ইমরান আয়াত 199 আরবি পাঠে(Al Imran).
  
   

﴿وَإِنَّ مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ لَمَن يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَمَا أُنزِلَ إِلَيْكُمْ وَمَا أُنزِلَ إِلَيْهِمْ خَاشِعِينَ لِلَّهِ لَا يَشْتَرُونَ بِآيَاتِ اللَّهِ ثَمَنًا قَلِيلًا ۗ أُولَٰئِكَ لَهُمْ أَجْرُهُمْ عِندَ رَبِّهِمْ ۗ إِنَّ اللَّهَ سَرِيعُ الْحِسَابِ﴾
[ آل عمران: 199]

আর আহলে কিতাবদের মধ্যে কেউ কেউ এমনও রয়েছে, যারা আল্লাহর উপর ঈমান আনে এবং যা কিছু তোমার উপর অবতীর্ণ হয় আর যা কিছু তাদের উপর অবতীর্ণ হয়েছে সেগুলোর উপর, আল্লাহর সামনে বিনয়াবনত থাকে এবং আল্লার আয়াতসমুহকে স্বল্পমুল্যের বিনিময়ে সওদা করে না, তারাই হলো সে লোক যাদের জন্য পারিশ্রমিক রয়েছে তাদের পালনকর্তার নিকট। নিশ্চয়ই আল্লাহ যথাশীঘ্র হিসাব চুকিয়ে দেন। [সূরা আলে-ইমরান: 199]

Surah Al Imran in Bangla

জহুরুল হক সূরা বাংলা Surah Al Imran ayat 199


আর নিঃসন্দেহ গ্রন্থপ্রাপ্তদের মধ্যে যারা ঈমান আনে আল্লাহ্‌তে আর যা তোমাদের কাছে অবতীর্ণ হয়েছে আর যা তা দের কাছে নাযিল হয়েছিল তাতে, আল্লাহ্‌র কাছে বিনীত, তারা আল্লাহ্‌র বাণীসমূহের জন্য স্বল্পমূল্য কামাতে যায় না। এরাই, -- এদের জন্য এদের পুরস্কার রয়েছে এদের প্রভুর কাছে। নিঃসন্দেহ আল্লাহ্ হিসেব-নিকেশে তৎপর।


Tafsir Mokhtasar Bangla


১৯৯. আহলে কিতাবদের সবাই কিন্তু আবার এক ধরনের নয়। তাদের মধ্যে কেউ কেউ আছে যারা আল্লাহ তা‘আলা এবং তোমাদের উপর যে সত্য ও হিদায়েত নাযিল করা হয়েছে, পাশাপাশি তাদের নিকট তাদের কিতাবে যা নাযিল করা হয়েছে সে সবের উপর বিশ্বাসী। তারা রাসূলদের মাঝে কোন পার্থক্য সৃষ্টি করে না। তারা আল্লাহর প্রতি বিনয়াবনত। তারা আল্লাহর নিকট রহমতের আশা করে। তারা আল্লাহর আয়াতের বিনিময়ে দুনিয়ার সামান্য ভোগ-বিলাস গ্রহণ করে না। যারা এ সকল বৈশিষ্ট্যের অধিকারী তাদের জন্য রয়েছে তাদের প্রভুর পক্ষ থেকে মহা প্রতিদান। বস্তুতঃ আল্লাহ তা‘আলা আমলের দ্রæত হিসাব ও তার দ্রæত প্রতিদান দানকারী।

Tafsir Ahsanul Bayan তাফসীরে আহসানুল বায়ান


নিশ্চয় গ্রন্থধারীদের মধ্যে এমন অনেকে রয়েছে যারা আল্লাহতে, তোমাদের প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে এবং তাদের প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে, তাতে আল্লাহর নিকট বিনয়াবনত হয়ে বিশ্বাস করে এবং আল্লাহর আয়াতকে স্বল্পমূল্যে বিক্রয় করে না;[১] এরাই তো সেই সকল লোক যাদের জন্য আল্লাহর নিকট পুরস্কার রয়েছে। নিশ্চয় আল্লাহ দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী। [১] এই আয়াতে আহলে-কিতাবের সেই দলের কথা বলা হয়েছে, যে দল রসূল ( সাঃ )-এর রিসালাতের উপর ঈমান এনে ধন্য হয়েছে। তাঁদের ঈমান এবং ঈমানী গুণাবলীর কথা উল্লেখ করে মহান আল্লাহ তাঁদেরকে এমন সব আহলে-কিতাব থেকে পৃথক করে দিলেন, যাদের কাজই ছিল ইসলাম, ইসলামের পয়গম্বর এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করা, আল্লাহর আয়াতের পরিবর্তন ও তার অস্পষ্ট ব্যাখ্যা করা এবং দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী সম্পদ লাভের জন্য ( প্রকৃত ) জ্ঞানকে গোপন করা। আল্লাহ তাআলা বললেন, আহলে-কিতাবদের মধ্যে যারা বিশ্বাসী ও মু'মিন, তারা এ রকম নয়, বরং তারা আল্লাহকে ভয় করে এবং সামান্য মূল্যের বিনিময়ে তারা আল্লাহর আয়াতকে বিক্রিও করে না। এর অর্থ হল, যে সব উলামা ও মাশায়েখ পার্থিব স্বার্থ অর্জনের জন্য আল্লাহর আয়াতের পরিবর্তন ঘটায় অথবা তার অর্থ ও ব্যাখ্যার সাথে বাতিল মিশ্রিত করে, তারা ঈমান ও আল্লাহভীরুতা থেকে বঞ্চিত। হাফেয ইবনে কাসীর লিখেছেন যে, আয়াতে আহলে-কিতাবের যে মু'মিনদের কথা উল্লিখিত হয়েছে, ইয়াহুদীদের মধ্য থেকে তাঁদের সংখ্যা দশ পর্যন্তও পৌঁছে না, তবে খ্রিষ্টানদের মধ্য হতে বহু সংখ্যক লোক ইসলাম গ্রহণ করে সত্য দ্বীনের অনুসারী হয়েছেন। ( ইবনে কাসীর )

Tafsir Abu Bakr Zakaria bangla কিং ফাহাদ কুরআন প্রিন্টিং কমপ্লেক্স


আর নিশ্চয় কিতাবীদের মধ্যে এমন লোকও আছে যারা আল্লাহ্‌র প্রতি বিনয়াবনত হয়ে তাঁর প্রতি এবং তিনি যা তোমাদের ও তাদের প্রতি নাযিল করেছেন তাতে ঈমান আনে। তারা আল্লাহ্‌র আয়াত তুচ্ছ মূল্যে বিক্রি করে না। তারাই, যাদের জন্য আল্লাহ্‌র কাছে পুরস্কার রয়েছে। নিশ্চয়ই আল্লাহ দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী []। [] আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন নাজ্জাসীর মৃত্যুর খবর ঘোষিত হল, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমরা তার উপর সালাত আদায় কর। তারা বললঃ হে আল্লাহ্‌র রাসূল, আমরা কি এ লোকটির উপর সালাত আদায় করব? তখন আল্লাহ্ তা’আলা এ আয়াত নাযিল করলেন। [ আল-আহাদীসুল মুখতারাহঃ ২০৩৮ ]

Tafsir ibn kathir bangla তাফসীর ইবনে কাসীর


১৯৯-২০০ নং আয়াতের তাফসীর: এখানে আল্লাহ তাআলা আহলে কিতাবের ঐ দলের প্রশংসা করছেন যারা পুরোপুরি ঈমান আনয়ন করেছিল। তারা কুরআন কারীমেও বিশ্বাস করে এবং নিজেদের কিতাবের উপরও বিশ্বাস রাখে। তারা অন্তরে আল্লাহ তা'আলার ভয় রেখে তার আদেশ পালনে সদা লিপ্ত থাকে। প্রভুর সামনে তারা বিনয় প্রকাশ করতঃ ক্রন্দন করে থাকে। তাদের কিতাবে শেষ নবী ( সঃ )-এর যেসব বিশেষণের বর্ণনা রয়েছে তা তারা গোপন করে না। বরং সকলকেই তা প্রদান করতঃ তাঁকে স্বীকার করে নিতে উৎসাহিত করে। এরূপ দল আল্লাহ তা'আলার নিকট পুণ্য প্রাপ্ত হবে, তারা ইয়াহুদীই হোক বা খ্রীষ্টানই হোক। সূরা-ইকাসাসের মধ্যে এ বিষয়টি নিম্নরূপ বর্ণিত হয়েছে-যাদেরকে আমি এর পূর্বে কিতাব দান করেছিলাম তারা ওর উপরেও ঈমান আনয়ন করে এবং এ কিতাব ( কুরআন কারীম ) তাদের নিকট পাঠ করা হয় তখন তারা স্পষ্টভাবে বলে, ‘আমরা ওর উপর ঈমান এনেছি। এটা আমাদের প্রভুর নিকট হতে সত্য কিতাব। আমরা তো প্রথম হতেই এটা মান্য করতাম। তাদেরকে তাদের ধৈর্যের দ্বিগুণ প্রতিদান দেয়া হবে। অন্য জায়গায় রয়েছে- যাদেরকে আমি গ্রন্থ প্রদান করেছি এবং যারা ওটা সঠিকভাবে পাঠ করে, তারা তো তৎক্ষণাৎ এ কুরআনের উপরও ঈমান এনে থাকে। আর এক জায়গায় ইরশাদ হচ্ছে- ( আরবী ) অর্থাৎ হযরত মূসা ( আঃ )-এর কওমের মধ্যেও একটি দল সত্যের পথ প্রদর্শনকারী এবং সত্যের সঙ্গেই সুবিচার প্রতিষ্ঠাকারী।' ( ৭:১৫৯ ) অন্য স্থানে রয়েছে-“ আহলে কিতাব সবাই সমান নয়, তাদের মধ্যে একটি দল রাত্রেও আল্লাহর কিতাব পাঠ করে থাকে এবং সিজদায় পড়ে যায় । আর এক জায়গায় রয়েছে-‘হে নবী ( সঃ )! তুমি বল হে মানবমণ্ডলী! তোমরা বিশ্বাস স্থাপন কর আর নাই কর, পূর্ব হতেই যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে যখন তাদের নিকট কুরআন কারীমের আয়াতসমূহ পাঠ করা হয় তখন তারা মুখের ভরে সিজদায় পড়ে যায় এবং বলে, আমাদের প্রভু পবিত্র, নিশ্চয়ই তার ওয়াদা সত্য হয়েই থাকবে। এরা কাঁদতে কাঁদতে মুখের ভরে পড়ে যায় এবং তাদের বিনয় বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়। ইয়াহূদীদের মধ্য এরূপ গুণসম্পন্ন লোক পাওয়া যায়, যদিও তাদের সংখ্যা ছিল খুব কম। যেমন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম ( রাঃ ) এবং তার মত আরও কয়েকজন ঈমানদার ইয়াহুদী আলেম। কিন্তু তাদের সংখ্যা দশের বেশী হবে না। খ্রীষ্টানদের অধিকাংশই সুপথে এসে গিয়েছিল এবং সত্যের অনুগত হয়েছিল। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে-“ তুমি অবশ্যই ইয়াহুদ ও মুশরিকদেরকে মুমিনদের প্রতি ভীষণ শত্রুতা পোষণকারী পাবে এবং তাদের প্রতি ভালবাসা স্থাপনকারী পাবে ঐ লোকদেরকে যারা বলে, আমরা খ্রীষ্টান । এখান হতে তারা যা বলেছে তার বিনিময়ে আল্লাহ তাদেরকে এমন জান্নাত প্রদান করবেন যার নিম্নদেশ দিয়ে স্রোতস্বিনীসমূহ প্রবাহিত হবে, তারা তথায় চিরকাল অবস্থান করবে। এ পর্যন্ত। এখন বলা হচ্ছে যে, এসব লোক বিরাট প্রতিদানের অধিকারী। হাদীস শরীফে এও রয়েছে যে, যখন হযরত জাফর ইবনে আবি তালিব ( রাঃ ) নাজ্জাসীর দরবারে বাদশাহ ও তার সভাসদবর্গের সামনে সূরা-ই-মারইয়াম পাঠ করেন তখন তার কান্না এসে যায়, ফলে বাদশাহ সহ উপস্থিত সমস্ত জনতাও কেঁদে ফেলেন এবং কাঁদতে কাঁদতে তাঁদের শত্রু সিক্ত হয়ে যায়। সহীহ বুখারী ও মুসলিম শরীফে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ ( সঃ ) সাহাবীগণকে নাজ্জাসীর মৃত্যুর সংবাদ প্রদান করতঃ বলেন, তোমাদের ভাই নাজ্জাসী আবিসিনিয়ায় মৃত্যুবরণ করেছেন। তার জানাযার নামায আদায় কর।অতঃপর তিনি মাঠে গিয়ে সাহাবীগণকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করতঃ তাঁর জানাযার নামায আদায় করেন। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যে রয়েছে যে, যখন নাজ্জাসী ইন্তেকাল করেন তখন রাসূলুল্লাহ ( সঃ ) সাহাবীগণকে বলেনঃ “ তোমাদের ভাই-এর জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা কর ।' এতে কতগুলো তোক বলে, রাসূলুল্লাহ ( সঃ ) আমাদেরকে সেই খ্রীষ্টানের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে বলছেন যে আবিসিনিয়ায় মারা গেছে। তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। কুরআন কারীমই যেন তার মুসলমান হওয়ার সাক্ষ্য প্রদান করছে। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ ( সঃ ) সাহাবীগণকে নাজ্জাসীর মৃত্যুর সংবাদ দিতে গিয়ে বলেনঃ “ তোমাদের ভাই আসহামা মারা গিয়েছেন । অতঃপর তিনি বাইরে বেরিয়ে যান এবং যেভাবে তিনি জানাযার নামায পড়াতেন ঐভাবেই চার তাকবীরে জানাযার নামায আদায় করেন। এতে মুনাফিকরা ঐ প্রতিবাদ করে এবং এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। সুনান-ই-আবি দাউদে রয়েছে, হযরত আয়েশা ( রাঃ ) বলেনঃ নাজ্জাসীর ইন্তেকালের পর আমরা এ শুনতে থাকি যে, তাঁর সমাধির উপর আলো দেখা যায়। মুসতাদরীক-ই-হাকীমে রয়েছে যে, নাজ্জাসীর এক শত্রু তাঁরই সাম্রাজ্য হতে তার উপর আক্রমণ চালায়। তখন মুহাজিরগণ বলেন, আপনি তার মোকাবিলার জন্যে চলুন। আমরাও আপনার সাথে রয়েছি। আপনি আমাদের বীরত্ব দেখে নেবেন এবং যে উত্তম ব্যবহার আপনি আমাদের সাথে করেছেন তার প্রতিদানও হয়ে যাবে। কিন্তু নাজ্জাসী তখন বলেন, 'মানুষের সাহায্য নিয়ে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করার চাইতে আল্লাহর সাহায্যের নিরাপত্তাই উত্তম। ঐ ব্যাপারেই এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। হযরত মুজাহিদ ( রঃ ) বলেন যে, এর দ্বারা আহলে কিতাবের মুসলমানকে বুঝানো হয়েছে। হযরত হাসান বসরী ( রঃ ) বলেন যে, এর দ্বারা ঐ আহলে কিতাবকে বুঝানো হয়েছে যারা রাসূলুল্লাহ ( সঃ )-এর পূর্বে ছিল, তারা ইসলামকে বুঝতে এবং রাসূলুল্লাহ ( সঃ )-এর অনুগত হওয়ারও তারা সৌভাগ্য লাভ করেছিল। কাজেই প্রতিদানও তাদেরকে দ্বিগুণ দেয়া হবে। এক প্রতিদান রাসূলুল্লাহ ( সঃ )-এর পূর্বেকার ঈমানের এবং দ্বিতীয় প্রতিদান হচ্ছে তাঁর প্রতি ঈমান আনয়নের প্রতিদান। সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে হযরত আবূ মূসা ( রাঃ ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ ( সঃ ) বলেছেনঃ ‘তিন প্রকারের লোক দ্বিগুণ প্রতিদান প্রাপ্ত হয়। তাদের মধ্যে একজন হচ্ছে আহলে কিতাবের ঐ ব্যক্তি যে স্বীয় নবীর উপর ঈমান এনেছে এবং আমার উপরও বিশ্বাস স্থাপন করেছে।'এরপরে আল্লাহ তা'আলা বলেন-তারা অল্পমূল্যে আল্লাহর নিদর্শনাবলী বিক্রী করে না। অর্থাৎ তাদের কাছে যে ধর্মীয় শিক্ষা বিদ্যমান রয়েছে তা তারা গোপন করে না, যেমন তাদের মধ্যকার এক ইতর শ্রেণীর লোকের ঐ অভ্যাস ছিল। বরং ঐলোকগুলো তো ঐ শিক্ষাকে বেশী করে প্রচার করতো। তাদের প্রতিদান তাদের প্রভুর নিকট রয়েছে। তারপর বলা হচ্ছে-“ নিশ্চয়ই আল্লাহ সত্বর হিসাব গ্রহণকারী ।' অর্থাৎ সত্বর একত্রিতকারী, পরিবেষ্টনকারী এবং গণনাকারী। অতঃপর আল্লাহ পাক বলেন-“ আমার পছন্দনীয় ধর্ম ইসলামের উপর প্রতিষ্ঠিত থাক । কঠিন অবস্থায়, সহজ অবস্থায়, বিপদের সময়, শান্তির সময় মোটকথা কোন অবস্থাতেই ওটা পরিত্যাগ করো না। এমনকি প্রাণবায়ু নির্গত হলে যেন ওরই উপর নির্গত হয় এবং ঐ শক্রদের হতেও ধৈর্য ধারণ কর ও সহিষ্ণুতা অবলম্বন কর যারা স্বীয় ধর্মকে গোপন করে থাকে।' ইমাম হাসান বসরী ( রঃ ) প্রভৃতি পূর্ববর্তী আলেমগণও এ তাফসীরই করেছেন। ইবাদতের স্থানকে স্থায়ী করা এবং তথায় অটলভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকাকে ( আরবী ) বলা হয়। আবার এক নামাযের পর অন্য নামাযের জন্যে অপেক্ষা করাকেও ( আরবী ) বলে। এটাই হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস ( রাঃ ), হযরত সাহল ইবনে হানীফ ( রঃ ) এবং হযরত মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব ( রঃ )-এর উক্তি। সহীহ মুসলিম ও সুনান-ই-নাসাঈতে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ ( সঃ ) বলেছেনঃ ‘এসো, আমি তোমাদেরকে এমন কাজ শিখিয়ে দেই যার ফলে আল্লাহ তা'আলা পাপ মার্জনা করেন এবং মর্যাদা বৃদ্ধি করেন( ১ ) কষ্টের সময় পূর্ণভাবে অযু করা, ( ২ ) মসজিদের দিকে গমন করা, ( ৩ ) এক নামাযের পর অন্য নামাযের জন্যে অপেক্ষা করা। ওটাই হচ্ছে ( আরবী ) ওটাই হচ্ছে ( আরবী ) এবং ওটাই হচ্ছে আল্লাহর পথের প্রস্তুতি গ্রহণ’। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যে রয়েছে যে, একদা হযরত আবু হুরাইরা ( রাঃ ) হযরত আবু সালমা ( রাঃ )-কে জিজ্ঞেস করেন, “ হে আমার ভ্রাতুস্পুত্র! তুমি এ আয়াতটির শান-ই-নমূল জান কি? হযরত আবূ সালমা ( রাঃ ) বলেন, আমার জানা নেই ।' তখন হযরত আবু হুরাইরা ( রাঃ ) বলেন, “ শুন, ঐ সময় কোন জিহাদ ছিল না । এ আয়াতটি ঐ লোকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয় যারা মসজিদকে আবাদ রাখতো এবং নামায ঠিক সময়ে আদায় করতো। অতঃপর আল্লাহ তাআলার যিকির করতো। তাদেরকেই নির্দেশ দেয়া হচ্ছে-‘তোমরা পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের উপর প্রতিষ্ঠিত থাক, স্বীয় আত্মা ও প্রবৃত্তিকে দমিয়ে রাখ, মসজিদের দিকে গমন করতে থাক এবং আল্লাহকে ভয় করতে থাক, আর এ কার্যগুলোই হচ্ছে জাহান্নামের শাস্তি হতে মুক্তি প্রাপ্তির কারণ।' তাফসীর-ই-ইবনে জারীরের হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ ( সঃ ) বলেনঃ “ আমি কি তোমাদেরকে এমন আমলের কথা বলে দেবো না যার ফলে আল্লাহ তা'আলা পাপসমূহ মার্জনা করেন ও মর্যাদা বৃদ্ধি করেন? ( ১ ) অসুবিধার সময় পূর্ণভাবে অযু করা, ( ২ ) এক নামাযের পর অন্য নামাযের জন্যে অপেক্ষা করা । এসব কাজেই তোমাদের প্রস্তুত থাকা উচিত।অন্য হাদীসে ‘খুব বেশী মসজিদের দিকে গমন করা এ কথাও রয়েছে। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, পাপ মোচনের সঙ্গে সঙ্গে ঐ আমলসমূহের দ্বারা মর্যাদাও বৃদ্ধি পেতে থাকে। এটাই হচ্ছে এ আয়াতের ভাবার্থ। কিন্তু এ হাদীসটি একেবারেই গারীব। হযরত আবু সালমা ইবনে আবদুর রহমান ( রাঃ ) বলেন- ( আরবী ) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে নামাযের জন্যে অপেক্ষা করা। কিন্তু উপরে বর্ণিত হয়েছে যে, এটা হচ্ছে হযরত আবু হুরাইরা ( রাঃ )-এর উক্তি। এও বলা হয়েছে যে, ( আরবী ) শব্দের অর্থ হচ্ছে শত্রুদের সাথে যুদ্ধ করা, ইসলামী সাম্রাজ্যের সীমান্তের রক্ষণাবেক্ষণ করা এবং শত্রুদেরকে ইসলামী শহরে প্রবেশ করতে না দেয়া। এর উৎসাহ দানের ব্যাপারেও বহু হাদীস রয়েছে এবং ওর জন্যে বড় বড় পুণ্য প্রদানের অঙ্গীকার রয়েছে। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে রাসূলুল্লাহ ( সঃ ) বলেনঃ ‘এক দিনের এ প্রস্তুতি সারা দুনিয়া ও ওর সমুদয় বস্তু হতে উত্তম। সহীহ মুসলিম শরীফে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ ( সঃ ) বলেছেনঃ “ এক দিবস ও রজনীর জিহাদের প্রস্তুতি এক মাসের পূর্ণ রোযা এবং এক মাসের সারা রাত্রির জাগরণ হতে উত্তম । ঐ প্রস্তুতির অবস্থায় তার মৃত্যু হয়ে গেলে সে.যত ভাল ভাল কাজ করতো সব কিছুরই সে পুণ্য পেতে থাকবে এবং অল্লাহ তা'আলার নিকট হতে তাকে আহার্য প্রদান করা হবে এবং গণ্ডগোল হতে সে নিরাপত্তা লাভ করবে।” মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ ( সঃ ) বলেছেনঃ প্রত্যেক মৃত ব্যক্তির আমল শেষ হয়ে যায়, কিন্তু যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে প্রস্তুতির কার্যে রয়েছে এবং ঐ অবস্থাতেই মারা গেছে তার আমল কিয়ামত পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে থাকবে ও তাকে কবরের শাস্তি হতে মুক্তি দেয়া হবে।' সুনান-ই-ইবনে মাজার বর্ণনায় এও রয়েছে যে, উত্থান দিবসের আতংক হতে সে নিরাপত্তা লাভ করবে। মুসনাদ-ই-আহমাদের অন্য হাদীসে রয়েছে যে, সকাল সন্ধ্যায় জান্নাত হতে আহার্য প্রদান করা হবে। কিয়ামত পর্যন্ত সে সৎকার্যে সুপ্রতিষ্ঠিত থাকার প্রতিদান পেতে থাকবে। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ ( সঃ ) বলেছেনঃ “ যে ব্যক্তি মুসলমানদের সীমান্তের কোন প্রান্তে তিন দিন ( জিহাদের ) প্রহরায় নিযুক্ত থাকে তাকে সারা বছর ধরে প্রহরায় নিযুক্ত থাকার প্রতিদান দেয়া হবে । আমীরুল মুমিনীন হযরত উসমান ইবনে আফফান ( রাঃ ) স্বীয় মিম্বরের উপর ভাষণ দান কালে একদা বলেন, “ আমি তোমাদেরকে রাসূলুল্লাহ ( সঃ )-এর মুখে শুনা কথা শুনাচ্ছি । আমি বিশেষ এক খেয়ালে এ পর্যন্ত তোমাদেরকে তা শুনাইনি। রাসূলুল্লাহ ( সঃ ) বলেছেনঃ আল্লাহর পথে এক ঘন্টা পাহারা দেয়া এক হাজার রাত্রির ইবাদত হতে উত্তম যে রাত্রিগুলো দাঁড়িয়ে এবং দিনগুলো রোযায় কাটিয়ে দেয়া হয় । এতদিন ধরে তার এ হাদীসটি বর্ণনা না করার কারণ তিনি বর্ণনা করেন, আমার ভয় ছিল যে, এ মর্যাদা লাভের উদ্দেশ্যে তোমরা সবাই হয়তো মদীনা ছেড়ে যুদ্ধক্ষেত্রে গমন করবে। এখন আমি তোমাদেরকে শুনিয়ে দিচ্ছি। প্রত্যেক ব্যক্তিরই এ স্বাধীনতা রয়েছে যে, যে কাজ সে নিজের জন্যে পছন্দ করে তা যেন সে পালন করে। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, তিনি পরে বলেনঃ “ আমি কি তোমাদের নিকট পৌছিয়ে দিয়েছি? জনগণ বলেঃ ‘হ্যা অতঃপর তিনি বলেন, হে আল্লাহ! আপনি সাক্ষী থাকুন। জামেউত তিরমিযীতে রয়েছে যে, হযরত শুরাহবিল ইবনে সামত ( রাঃ ) সীমান্ত প্রহরায় নিযুক্ত ছিলেন। বহুদিন অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পর তিনি কিছু সংকীর্ণ মনা হয়ে পড়েছিলেন। এমন সময় হযরত সালমান ফারেসী ( রাঃ ) তাঁর নিকট পৌছেন এবং বলেন, আমি তোমাকে রাসূলুল্লাহ ( সঃ )-এর একটি হাদীস শুনাবো। তিনি বলেছেনঃ ‘একদিন সীমান্ত প্রহরায় নিযুক্ত থাকা এক মাসের রোযা ও দাঁড়িয়ে ইবাদত হতে উত্তম। যে ব্যক্তি ঐ অবস্থাতেই মারা যায় সে কবরের শাস্তি হতে মুক্তি পায় এবং কিয়ামত পর্যন্ত তার কাজ চালু থাকে। সুনান-ই-ইবনে মাজার মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ ( সঃ ) বলেছেনঃ “ মুসলমানদেরকে নিরাপদে রাখার উদ্দেশ্যে একরাত্রি আল্লাহর পথে পাহারা দেয়া একশ বছরের ইবাদত অপেক্ষা উত্তম, যদিও ঐ রাত্রি রমযানের রাত্রি না হয়, যে একশ বছরের দিনগুলো রোযায় এবং রাত্রিগুলো তাহাজ্জুদে কাটিয়ে দেয়া হয় । আর মুসলমানদেরকে নিরাপদে রাখার উদ্দেশ্যে এবং পুণ্য লাভের নিয়তে রমযান মাসের দিন ছাড়াও কোন একটি দিনে আল্লাহর পথে যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুতি গ্রহণ করা হাজার বছরের রোযা ও তাহাজ্জুদ হতে উত্তম। এখন যদি এ গাযী সহীহ সালামতে স্বীয় পরিবারের নিকট আগমন করে তবে এক হাজার বছরের পাপ তার আমল নামায় লিখা হয় না। কিন্তু পুণ্য লিখা হয় এবং সে কিয়ামত পর্যন্ত যুদ্ধক্ষেত্রে অটল থাকার পুণ্য পেতে থাকে।” এ হাদীসটি গারীব এমনকি পরিত্যক্ত। এর একজন বর্ণনাকারী মিথ্যায় অভিযুক্ত। সুনান-ই-ইবনে মাজার একটি গারীব হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ ( সঃ ) বলেছেনঃ মুসলমান সৈন্যদের পিছনে এক রাত্রির পাহারা এক বছরের রাত্রি দাড়িয়ে ইবাদত করা হতে এবং দিনগুলোর রোযা রাখা হতে উত্তম। প্রত্যেক বছরের মধ্যে তিনশ ষাট দিন রয়েছে এবং প্রত্যেক দিন বছরের মত।' এ হাদীসটির একজন বর্ণনাকারী হচ্ছে সাঈদ ইবনে খালিদ, হযরত আবু যারআ’ ( রঃ ) প্রভৃতি ইমামগণ তাকে দুর্বল বলেছেন। বরং ইমাম হাকিম ( রঃ ) বলেন যে, তার বর্ণনাকৃত হাদীসসমূহের মধ্যে মাওযূ' হাদীসও রয়েছে। একটি মুনকাতা হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ ( সঃ ) বলেছেনঃ “ ইসলামের সৈন্যের প্রহরীর উপর আল্লাহর করুণা বর্ষিত হোক ।' ( সুনান-ই-ইবনে মাজা ) হযরত সাহল ইবনে হানযালা ( রাঃ ) বলেন, হুনায়েনের যুদ্ধে আমরা রাসূলুল্লাহ ( সঃ )-এর সাথে গমন করি। আমি রাসূলুল্লাহ ( সঃ )-এর সাথে মাগরিবের নামায আদায় করি এমন সময় একজন অশ্বারোহী এসে বলে, “ হে আল্লাহর রাসূল ( সঃ )! আমি অগ্রে বেড়ে গিয়েছিলাম এবং অমুক পাহাড়ের উপর আরোহণ করে আমি লক্ষ্য করি যে, হাওয়াযেম গোত্রের লোক যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হয়ে গেছে । তাদের সাথে উট, ছাগল, স্ত্রীলোক এবং শিশুরাও রয়েছে।' একথা শুনে রাসূলুল্লাহ ( সঃ ) একটু মুচকি হেসে উঠে বলেনঃ ইনশাআল্লাহ! এ সবগুলো মুসলমানদের যুদ্ধলব্ধ মালের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। অতঃপর তিনি বলেনঃ “ আজকের রাত্রের পাহারা দেবে কে? হযরত আনাস ইবনে আবু মুরশিদ ( রঃ ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল ( সঃ )! আমি প্রস্তুত আছি' । রাসূলুল্লাহ ( সঃ ) বলেনঃ 'যাও, সোয়ারী নিয়ে এসো।' তিনি ঘোড়ায় আরোহণ করে হাযির হন এবং রাসূলুল্লাহ ( সঃ ) তাঁকে বলেনঃ “ এ ঘাটিতে চলে যাও এবং ঐ পর্বতের চূড়ায় আরোহণ কর । সাবধান! সকাল পর্যন্ত তাদের সাথে যেন তোমাদের কোন প্রকার বিরক্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়।” ফজর হলে রাসূলুল্লাহ ( সঃ ) নামাযের জায়গায় এসে দু' রাকআত সুন্নত আদায় করেন এবং জনগণকে জিজ্ঞেস করেনঃ “ বল তো, তোমাদের অশ্বারোহী প্রহরীর কোন পদশব্দ শুনা যাবে কি?” জনগণ বলে, “হে আল্লাহর রাসূল ( সঃ )! না ।” তখন নামাযের জন্য তাকবীর দেয়া হয় এবং তিনি নামায আরম্ভ করেন। তাঁর খেয়াল ঘাটির দিকেই ছিল। নামাযের সালাম ফিরিয়েই তিনি বলেনঃ “ তোমরা খুশী হও । তোমাদের অশ্বারোহী আসছে। আমরাও ঝোপের মধ্য হতে উঁকি মেরে দেখি। অল্পক্ষণের মধ্যে আমরাও দেখতে পাই। সে এসেই রাসূল ( সঃ )-কে বলে, “ হে আল্লাহর রাসূল ( সঃ )! আমি এ উপত্যকার উপরের অংশে পৌছে গিয়েছিলাম এবং আপনার নির্দেশক্রমে তথায়ই রাত্রি অতিবাহিত করি । সকালে আমি অন্য ঘাঁটিও দেখে লই কিন্তু সেখানেও কেউ নেই।” রাসূলুল্লাহ ( সঃ ) তখন তাকে বলেন, রাত্রে তুমি ওখান হতে নীচেও নেমেছিলে কি? তিনি বলেনঃ “ না, শুধু নামাযের জন্যে এবং প্রস্রাব পায়খানার জন্যে নীচে নেমেছিলাম ।রাসূলুল্লাহ ( সঃ ) তখন তাকে বলেনঃ “ তুমি নিজের জন্যে জান্নাত ওয়াজিব করে নিয়েছে । এরপর আর কোন আমল না করলেও কোন ক্ষতি নেই।” ( সুনান-ই-আবি দাউদ ও নাসাঈ ) মুসনাদ -ই-আহমাদে রয়েছে, হযরত আবু রায়হানা বলেন, “ এক যুদ্ধে আমরা একটি উঁচু ভূমির উপর ছিলাম । অত্যন্ত ঠাণ্ডা পড়ছিল। শেষ পর্যন্ত লোক গর্ত খনন করে তাতে পড়ে রয়েছিল। সে সময় রাসূলুল্লাহ ( সঃ ) ডাক দিয়ে বলেনঃ “ আজ রাত্রে আমাদেরকে পাহারা দেবে এবং আমাদের নিকট হতে উত্তম দু'আ নেবে এমন কেউ আছে কি?” একথা শুনে একজন আনসারী ( রাঃ ) দাঁড়িয়ে গিয়ে বলেন, “হে আল্লাহর রাসূল ( সঃ )! আমি প্রস্তুত আছি ।রাসূলুল্লাহ ( সঃ ) তাঁকে নিজের কাছে ডেকে নিয়ে তাঁর নাম জিজ্ঞেস করতঃ তাঁর জন্যে বহু দু'আ করেন। আমি এ দু'আ শুনে সম্মুখে অগ্রসর হয়ে বলি, হে আল্লাহর রাসূল ( সঃ )! আমিও পাহারা দেবো। তিনি আমাকেও পার্শ্বে ডেকে নেন এবং নাম জিজ্ঞেস করে আমার জন্যেও দু'আ করেন। কিন্তু ঐ আনসারী সাহাবীর তুলনায় কম ছিল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ ( সঃ ) বলেনঃ “ ঐ চক্ষুর উপর জাহান্নামের তাপ হারাম যে আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দন করে এবং ঐ চক্ষুর উপরেও জাহান্নামের তাপ হারাম যে আল্লাহর পথে রাত্রি জাগরণ করে ।” মুসনাদ-ই- আহমাদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ ( সঃ ) বলেনঃ “ যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায়, বাদশাহর পক্ষ হতে বেতন ছাড়াই মুসলমানদের পিছন হতে তাদের উপর পাহারা দেয় সে স্বীয় চক্ষু দ্বারাও জাহান্নামের আগুন দর্শন করবে না, কিন্তু শুধুমাত্র কসম পুরো হওয়ার জন্যে ( দর্শন করবে )” যেমন নিম্নের আয়াতে রয়েছে- ( আরবী ) অর্থাৎ “ তোমাদের মধ্যে সবাই ওর উপর আগমন করবে ।( ১৯:৭১ ) সহীহ বুখারীর মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ ( সঃ ) বলেছেনঃ “ স্বর্ণ মুদ্রার দাস রৌপ্য মুদ্রার দাস এবং বস্ত্রের দাস ধ্বংস হয়েছে । যদি তাকে সম্পদ দেয়া হয় তবে সে খুশী হয় এবং না দেয়া হলে অসন্তুষ্ট হয়, সে ধ্বংস হয়েছে এবং বিনষ্ট হয়েছে। তার পায়ে কাঁটা ঢুকলে তা বের করার চেষ্টাও করা হয় না। সৌভাগ্যবান ও উন্নতশীল ঐ ব্যক্তি যে আল্লাহর পথে যুদ্ধ করার জন্যে স্বীয় অশ্বের বগা ধারণ করে থাকে, তার মাথার চুল বিক্ষিপ্ত, পদদ্বয় ময়লা যুক্ত। তাঁকে পাহারায় নিযুক্ত করলে পাহারা দিয়ে থাকে, সেনাবাহিনীর অগ্রে নিযুক্ত করলে তাতেও খুশী হয়। লোকের দৃষ্টিতে সে এত নিকৃষ্ট যে, সে যেতে চাইলে অনুমতি পায় না, কারও জন্যে সুপারিশ করলে তা গৃহীত হয় না। আল্লাহ তা'আলারই সমস্ত প্রশংসা যে, এ আয়াত সম্পর্কীয় বিশেষ বিশেষ হাদীসসমূহ বর্ণিত হলো। তার দয়া ও অনুগ্রহের উপর আমরা তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। দুনিয়ায় থাকা পর্যন্ত তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হতে আমরা ক্ষান্ত হতে পারি না। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরের মধ্যে রয়েছে যে, হযরত আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ ( রাঃ ) যুদ্ধক্ষেত্র হতে আমীরুল মুমিনীন, খালীফাতুল মুসলিমীন হযরত উমার ইবনে খাত্তাব ( রাঃ )-কে একটি পত্র লিখেন এবং সেই পত্রে রোমক সৈন্যদের আধিক্য, তাদের যুদ্ধাস্ত্রের অবস্থা এবং তাদের প্রস্তুতির অবস্থা বর্ণনা করেন এবং লিখেন যে, ভীষণ বিপদের আশংকা রয়েছে। হযরত উমার ( রাঃ ) উত্তর পত্র প্রেরণ করেন যাতে আল্লাহর প্রশংসার পরে লিখিত ছিলঃ “ মাঝে মাঝে মুমিন বান্দাদের উপরেও কঠিন বিপদ-আপদ নেমে আসে । কিন্তু আল্লাহ তাআলা সেই কঠিন বিপদের পর তাদের পথ সহজ করে দেন। জেনে রেখো যে, ছুটি সরলতার উপর একটি কাঠিন্য জয়যুক্ত হতে পারে না। দেখ আল্লাহ পাক ঘোষণা করেন-অর্থাৎ “ হে মুমিনগণ! তোমরা ধৈর্য অবলম্বন কর এবণ সহিষ্ণু ও সুপ্রতিষ্ঠিত হও এবং আল্লাহকে ভয় কর, যেন তোমরা মুক্তি প্রাপ্ত হও ।” হিজরী ১৭০ অথবা ১৭৭ সনে তারসুস শহরে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক ( রঃ ) যখন জিহাদে যাওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করছিলেন তখন হযরত মুহাম্মাদ ইবনে ইবরাহীম ইবনে সাকীনা ( রঃ ) তাঁকে বিদায় দেয়ার জন্যে এসেছিলেন। সে সময় হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক ( রঃ ) নিম্নলিখিত কবিতা লিখে হযরত মুহাম্মাদ ইবনে ইবরাহীম ( রঃ )-এর হাতে হযরত ফুযাইল ইবনে আয়াস ( রঃ )-এর নিকট পাঠিয়ে দেনঃ ( আরবী ) অর্থাৎ “ হে মক্কা ও মদীনায় অবস্থান করে ইবাদতকারী! আপনি যদি আমাদের মুজাহিদগণকে দেখতেন তবে আপনি অবশ্যই জানতে পারতেন যে, আপনি ইবাদতে খেল-তামাশা করছেন মাত্র । এক ঐ ব্যক্তি যার নয়না তার গণ্ডদেশ সিক্ত করে এবং এক আমরা যারা স্বীয় স্কন্ধ আল্লাহর পথে কাটিয়ে দিয়ে নিজেদের রক্তে নিজেরাই গোসল করে থাকি। এক ঐ ব্যক্তি যার ঘোড়া মিথ্যা ও বাজে কাজে ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং আমাদের ঘোড়া আক্রমণ ও যুদ্ধের দিনেই শুধু ক্লান্ত হয়। আগর বাতির সুগন্ধি হচ্ছে আপনাদের জন্যে, আর আমাদের জন্যে আগর বাতির সুগন্ধি হচ্ছে ঘোড়ার খুরের মাটি ও পবিত্র ধূলাবালি। নিশ্চিতরূপে জেনে রাখুন, আমাদের নিকট নবী ( সঃ )-এর এ হাদীসটি পৌঁছেছে যা সম্পূর্ণ সত্য এবং মিথ্যা হতে পারে না, তা এই যে, যার নাসিকায় সেই আল্লাহর সৈন্যের ধূলাবালিও পৌঁছেছে তার নাসিকায় অগ্নিশিখা যুক্ত জাহান্নামের আগুনের ধুয়াও প্রবেশ করবে না। নিন, এ হচ্ছে আল্লাহর কিতাব যা আমাদের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে এবং স্পষ্টভাবে বলছে ও সত্য বলছে যে, শহীদ মৃত নয়।হযরত মুহাম্মদ ইবনে ইবরাহীম বলেন, যখন আমি মসজিদে হারামে পৌছে হযরত ফুযাইল ইবনে আয়াস ( রঃ )-কে এ কবিতাগুলো প্রদর্শন করি তখন তিনি কান্নায় ফেটে পড়েন এবং বলেন, “ আবু আব্দির রহমানের উপর আল্লাহ দয়া করুন! তিনি সত্য কথাই বলেছেন এবং আমাকে উপদেশ দিয়েছেন ও আমার খুবই মঙ্গল কামনা করছেন ।” অতঃপর আমাকে বলেন, “ তুমি কি হাদীস লিখে থাক?” আমি বলি জ্বি, হঁ্যা । তিনি বলেন, “ আচ্ছা, তুমি যখন এ উপদেশনামা আমার নিকট নিয়ে এসেছে তখন তার পরিবর্তে আমি তোমার দ্বারা একটি হাদীস লিখিয়ে নিচ্ছি ।” হাদীসটি নিম্নরূপঃরাসূলুল্লাহ ( সঃ )-এর নিকট এক ব্যক্তি আবেদন করেন- “ হে আল্লাহর রাসূল ( সঃ )! আপনি আমাকে এমন আমল শিখিয়ে দিন যা পালন করলে আমি মুজাহিদের পুণ্য লাভ করতে পারি । তিনি তখন তাকে বলেনঃ “ তোমার মধ্যে কি এ শক্তি আছে যে, তুমি নামায পড়তেই থাকবে, কখনও ক্লান্ত হবে না এবং রোযা রাখতেই থাকবে এবং কখনও বে-রোযা থাকবে না?' লোকটি বলে, “হে আল্লাহর রাসূল ( সঃ )! এর শক্তি কোথায়? আমি তো এ ব্যাপারে অত্যন্ত দুর্বল রাসূলুল্লাহ ( সঃ ) তখন লোকটিকে বলেনঃ “ যদি তোমার মধ্যে এরূপ শক্তি থাকতো এবং তুমি এরূপ করতেও থাকতে তথাপি আল্লাহর পথে জিহাদকারীর মর্যাদা লাভ করতে পারতে না । তুমিও তো এটা জান যে, যদি মুজাহিদদের ঘোড়ার দড়ি লম্বা হয়ে যায় এবং সে এদিক ওদিক চড়ে যায় তবে তজ্জন্যেও মুজাহিদের পুণ্য লিখা হয়।”এরপরে আল্লাহ পাক নির্দেশ দিচ্ছেন- “ তোমরা আল্লাহকে ভয় করতে থাক এবং এ ভয় সর্বাবস্থায়, সব সময়, সর্বকাজে থাকতে হবে ।রাসূলুল্লাহ ( সঃ ) হযরত মুআয ইবনে জাবাল ( রাঃ )-কে যখন ইয়ামনে প্রেরণ করেন তখন তিনি তাঁকে বলেনঃ “ হে মুআয! যেখানেই থাক না কেন অন্তরে আল্লাহর ভয় । রাখবে। যদি তোমার দ্বারা কোন পাপকার্য হয়ে যায় তবে তৎক্ষণাৎ কোন পুণ্যের কাজও করবে, যেন সেই পাপ মোচন হয়ে যায়। আর জনগণের সাথে উত্তম ব্যবহার করবে।”তারপরে আল্লাহ তা'আলা বলেন- এ চারটি কাজ করলে তোমাদের উদ্দেশ্য সফল হবে এবং দুনিয়া ও আখেরাতে তোমরা মুক্তি পেয়ে যাবে।' হযরত মুহাম্মাদ ইবনে কারাযী ( রঃ ) বলেন, এর ভাবার্থ হচ্ছে, 'তোমরা আমার খেয়াল রাখ, আমার ভয়ে কাঁপতে থাক। আমার ও তোমাদের কার্যের ব্যাপার সংযমী হও। যখন আমার উপর ভরসা করবে তখন তোমরা মুক্তিপ্রাপ্ত ও সফলকাম হবে।'

সূরা আলে-ইমরান আয়াত 199 সূরা

وإن من أهل الكتاب لمن يؤمن بالله وما أنـزل إليكم وما أنـزل إليهم خاشعين لله لا يشترون بآيات الله ثمنا قليلا أولئك لهم أجرهم عند ربهم إن الله سريع الحساب

سورة: آل عمران - آية: ( 199 )  - جزء: ( 4 )  -  صفحة: ( 76 )


English Türkçe Indonesia
Русский Français فارسی
تفسير Urdu اعراب

বাংলায় পবিত্র কুরআনের আয়াত

  1. রাজত্ব সেদিন আল্লাহরই; তিনিই তাদের বিচার করবেন। অতএব যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকর্ম সম্পাদন
  2. তিনি বললেনঃ যে কেউ সীমালঙ্ঘনকারী হবে আমি তাকে শাস্তি দেব। অতঃপর তিনি তাঁর পালনকর্তার কাছে
  3. এবং প্রবৃত্তির তাড়নায় কথা বলেন না।
  4. এরা আপনার কাছে মঙ্গলের পরিবর্তে দ্রুত অমঙ্গল কামনা করে। তাদের পূর্বে অনুরূপ অনেক শাস্তিপ্রাপ্ত জনগোষ্ঠী
  5. নিশ্চয় নভোমন্ডল ও ভূ-মন্ডলে মুমিনদের জন্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে।
  6. আর তোমরা নিজেদের পালনকর্তা সমীপে ক্ষমা প্রার্থনা কর। অনন্তর তাঁরই প্রতি মনোনিবেশ কর। তাহলে তিনি
  7. হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর, রসূলের (সাঃ) আনুগত্য কর এবং নিজেদের কর্ম বিনষ্ট করো
  8. এখন একথা বলছ! অথচ তুমি ইতিপূর্বে না-ফরমানী করছিলে। এবং পথভ্রষ্টদেরই অন্তর্ভুক্ত ছিলে।
  9. তার মাতা, তার পিতা,
  10. এখন আমাদের আর মৃত্যু হবে না।

বাংলায় কোরআনের সূরা পড়ুন :

সুরত আল বাক্বারাহ্ আলে ইমরান সুরত আন-নিসা
সুরত আল-মায়েদাহ্ সুরত ইউসুফ সুরত ইব্রাহীম
সুরত আল-হিজর সুরত আল-কাহফ সুরত মারইয়াম
সুরত আল-হাজ্জ সুরত আল-ক্বাসাস আল-‘আনকাবূত
সুরত আস-সাজদা সুরত ইয়াসীন সুরত আদ-দুখান
সুরত আল-ফাতহ সুরত আল-হুজুরাত সুরত ক্বাফ
সুরত আন-নাজম সুরত আর-রাহমান সুরত আল-ওয়াক্বি‘আহ
সুরত আল-হাশর সুরত আল-মুলক সুরত আল-হাক্কাহ্
সুরত আল-ইনশিক্বাক সুরত আল-আ‘লা সুরত আল-গাশিয়াহ্

সবচেয়ে বিখ্যাত কোরআন তেলাওয়াতকারীদের কণ্ঠে সূরা আলে-ইমরান ডাউনলোড করুন:

সূরা Al Imran mp3 : উচ্চ মানের সাথে সম্পূর্ণ অধ্যায়টি Al Imran শুনতে এবং ডাউনলোড করতে আবৃত্তিকারকে বেছে নিন
সুরত আলে-ইমরান  ভয়েস আহমেদ আল-আজমি
আহমেদ আল-আজমি
সুরত আলে-ইমরান  ভয়েস ইব্রাহীম আল-আখদার
ইব্রাহীম আল-আখদার
সুরত আলে-ইমরান  ভয়েস বান্দার বেলাইলা
বান্দার বেলাইলা
সুরত আলে-ইমরান  ভয়েস খালিদ গালিলি
খালিদ গালিলি
সুরত আলে-ইমরান  ভয়েস হাতেম ফরিদ আল ওয়ার
হাতেম ফরিদ আল ওয়ার
সুরত আলে-ইমরান  ভয়েস খলিফা আল টুনাইজি
খলিফা আল টুনাইজি
সুরত আলে-ইমরান  ভয়েস সাদ আল-গামদি
সাদ আল-গামদি
সুরত আলে-ইমরান  ভয়েস সৌদ আল-শুরাইম
সৌদ আল-শুরাইম
সুরত আলে-ইমরান  ভয়েস সালাহ আবু খাতর
সালাহ বুখাতীর
সুরত আলে-ইমরান  ভয়েস আবদুল বাসিত আব্দুল সামাদ
আবদ এল বাসেট
সুরত আলে-ইমরান  ভয়েস আবদুল রশিদ সুফি
আবদুল রশিদ সুফি
সুরত আলে-ইমরান  ভয়েস আব্দুল্লাহ্ বাস্‌ফার
আব্দুল্লাহ্ বাস্‌ফার
সুরত আলে-ইমরান  ভয়েস আবদুল্লাহ আওওয়াদ আল-জুহানী
আবদুল্লাহ আল-জুহানী
সুরত আলে-ইমরান  ভয়েস আলী আল-হুদায়েফি
আলী আল-হুদায়েফি
সুরত আলে-ইমরান  ভয়েস আলী জাবের
আলী জাবের
সুরত আলে-ইমরান  ভয়েস ফারেস আব্বাদ
ফারেস আব্বাদ
সুরত আলে-ইমরান  ভয়েস মাহের আলমাইকুলই
মাহের আলমাইকুলই
সুরত আলে-ইমরান  ভয়েস মোহাম্মদ আইয়ুব
মোহাম্মদ আইয়ুব
সুরত আলে-ইমরান  ভয়েস মুহাম্মদ আল-মুহাইসনি
মুহাম্মদ আল-মুহাইসনি
সুরত আলে-ইমরান  ভয়েস মুহাম্মাদ জিব্রীল
মুহাম্মাদ জিব্রীল
সুরত আলে-ইমরান  ভয়েস মুহাম্মদ সিদ্দিক আল মিনশাবি
আল-মিনশাবি
সুরত আলে-ইমরান  ভয়েস আল হোসারি
আল হোসারি
সুরত আলে-ইমরান  ভয়েস আল-আফসী
মিশারী আল-আফসী
সুরত আলে-ইমরান  ভয়েস নাসের আল কাতামি
নাসের আল কাতামি
সুরত আলে-ইমরান  ভয়েস ইয়াসের আল-দোসারি
ইয়াসের আল-দোসারি


Friday, June 5, 2026

Please remember us in your sincere prayers