কোরান সূরা আনফাল আয়াত 67 তাফসীর
﴿مَا كَانَ لِنَبِيٍّ أَن يَكُونَ لَهُ أَسْرَىٰ حَتَّىٰ يُثْخِنَ فِي الْأَرْضِ ۚ تُرِيدُونَ عَرَضَ الدُّنْيَا وَاللَّهُ يُرِيدُ الْآخِرَةَ ۗ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ﴾
[ الأنفال: 67]
নবীর পক্ষে উচিত নয় বন্দীদিগকে নিজের কাছে রাখা, যতক্ষণ না দেশময় প্রচুর রক্তপাত ঘটাবে। তোমরা পার্থিব সম্পদ কামনা কর, অথচ আল্লাহ চান আখেরাত। আর আল্লাহ হচ্ছেন পরাক্রমশালী হেকমতওয়ালা। [সূরা আনফাল: 67]
Surah Al-Anfal in Banglaজহুরুল হক সূরা বাংলা Surah Anfal ayat 67
একজন নবীর জন্য সংগত নয় যে তাঁর জন্য বন্দীদের রাখা হোক যে পর্যন্ত না তিনি দেশে জয়লাভ করেছেন। তোমরা চাও পার্থিব সম্পদ, অথচ আল্লাহ্ চান পরলোক। আর আল্লাহ্ মহাশক্তিশালী, পরমজ্ঞানী।
Tafsir Mokhtasar Bangla
৬৭. কোন নবীর সাথে যুদ্ধরত কাফিরদের মাঝে প্রচুর হত্যাকাÐ ঘটিয়ে তাদেরকে ভালোভাবে পর্যুদস্ত না করা পর্যন্ত নিজের কাছে বন্দী রাখা তাঁর জন্য উচিৎ হবে না। যেন তাদের অন্তরে ভীতি সঞ্চারিত হয় এবং তারা তাঁর সাথে দ্বিতীয়বার যুদ্ধ করতে না আসে। হে মু’মিনরা! তোমরা মূলতঃ বদরের কাফিরদেরকে বন্দী করে তাদের থেকে মুক্তিপণ নিতে চাও। অথচ আল্লাহ তা‘আলা আখিরাত চাচ্ছেন যা ধর্মের বিজয় ও তার পরাক্রমশীলতার মাধ্যমে হাসিল করা সম্ভব। বস্তুতঃ আল্লাহ তা‘আলা তাঁর সত্তা, গুণাবলী ও ক্ষমতায় অপ্রতিদ্ব›দ্বী। তাঁকে কেউ পরাজিত করতে পারে না। তেমনিভাবে তিনি তাঁর শরীয়ত প্রণয়নে ও তাক্বদীর নির্ধারণে অতি প্রজ্ঞাময়।
Tafsir Ahsanul Bayan তাফসীরে আহসানুল বায়ান
দেশে সম্পূর্ণভাবে শত্রু নিপাত না করা পর্যন্ত বন্দী রাখা কোন নবীর জন্য সঙ্গত নয়। তোমরা কামনা কর পার্থিব সম্পদ এবং আল্লাহ চান পরলোকের কল্যাণ। [১] আর আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। [১] বদর যুদ্ধে ৭০ জন কাফের মারা পড়ল এবং ৭০ জন বন্দী হল। এটা কাফের ও মুসলিমদের প্রথম যুদ্ধ ছিল। এই জন্য যুদ্ধবন্দীদের ব্যাপারে কি ধরনের আচরণ করা যেতে পারে এ ব্যাপারে পূর্ণরূপে কোন বিধান স্পষ্ট ছিল না। সুতরাং নবী ( সাঃ ) সেই ৭০ জন বন্দীদের ব্যাপারে সাহাবাদের সঙ্গে পরামর্শ করলেন যে, কি করা যাবে? তাদেরকে হত্যা করা হবে, না কিছু মুক্তিপণ ( বিনিময় ) নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হবে? বৈধতা হিসাবে এই দু'টি রায়ই সঠিক ছিল। সেই জন্য উক্ত দু'টি রায় নিয়ে বিবেক-বিবেচনা ও চিন্তা-ভাবনা করতে লাগলেন। কিন্তু কখনো কখনো বৈধতা ও অবৈধতা থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে কাল-পাত্র ও পরিস্থিতি বুঝে অধিকতর উত্তম পন্থা অবলম্বন করার প্রয়োজন হয়। এখানেও অধিকতর কল্যাণকর পন্থা অবলম্বন করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বৈধতাকে সামনে রেখে অপেক্ষাকৃত কমতর কল্যাণকর পন্থা অবলম্বন করা হল। যে ব্যাপারে সতর্ক করে আল্লাহ তাআলার তরফ হতে ভৎর্সনাস্বরূপ আয়াত অবতীর্ণ হল। উমার ( রাঃ ) প্রভৃতিগণ নবী ( সাঃ )-কে এই পরামর্শ দিলেন যে, কুফরের শক্তি ও প্রতাপকে ভেঙ্গে ফেলা দরকার আছে। এই জন্য বন্দীদেরকে হত্যা করা হোক। কেননা, এরা হল কুফর ও কাফেরদের প্রধান ও সম্মানিত ব্যক্তি। এরা মুক্তি পেলে ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে অধিকরূপে চক্রান্ত চালাবে। পক্ষান্তরে আবু বাকর ( রাঃ ) প্রভৃতিগণ উমার ( রাঃ )-এর রায়ের বিপরীত রায় পেশ করলেন যে, তাদের কাছ থেকে মুক্তিপণ ( বিনিময় ) নিয়ে তাদেরকে ছেড়ে দেওয়া হোক। আর ঐ মাল দ্বারা আগামী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হোক। নবী ( সাঃ ) এই রায়কে প্রাধান্য দিলেন। তখন এ ব্যাপারে আয়াত অবতীর্ণ হল, {حَتَّى يُثْخِنَ فِي الأَرْض}। এর মতলব হল যদি দেশে কুফরের আধিপত্য হয় ( যেমন, সেই সময় আরবে কুফরের আধিপত্য ছিল ), তাহলে এ অবস্থায় বন্দী কাফেরদেরকে হত্যা করে তাদের শক্তির মাথাকে চূর্ণ করে ফেলা আবশ্যক। সুতরাং তোমরা এই সূক্ষ্ম নীতিকে দৃষ্টিচ্যুত করে যে মুক্তিপণ ( বিনিময় ) গ্রহণ করলে, তার মানে হল অধিকতর উত্তম পন্থা বর্জন করে অপেক্ষাকৃত নিম্নমানের পন্থা অবলম্বন করলে; যা তোমাদের ভুল এখতিয়ার। পরবর্তীতে যখন কুফরের প্রভাব কম হয়ে গেল, তখন বন্দীদের ব্যাপার সেই সমসাময়িক রাষ্ট্রনেতার ইচ্ছার উপর ছেড়ে দেওয়া হল। তিনি চাইলে তাদেরকে হত্যা করবেন, নতুবা মুক্তিপণ নিয়ে মুক্ত করে দেবেন। কিম্বা মুসলিম বন্দীদের বিনিময়ে তাদেরকে মুক্ত করবেন। অথবা চাইলে তাদেরকে দাস বানিয়ে রাখবেন। অবস্থা ও পরিস্থিতি সমীক্ষা করে উক্ত কোন একটি পন্থা অবলম্বন করা বৈধ হবে।
Tafsir Abu Bakr Zakaria bangla কিং ফাহাদ কুরআন প্রিন্টিং কমপ্লেক্স
কোন নবীর জন্য সংগত নয় যে [ ১ ] তার নিকট যুদ্ধবন্দি থাকবে, যতক্ষণ না তিনি যমীনে ( তাদের ) রক্ত প্রবাহিত করেন [ ২ ]। তোমরা কামনা কর পার্থিব সম্পদ [ ৩ ] এবং আল্লাহ্ চান আখেরাত; আর আল্লাহ্ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। [ ১ ] আয়াতটি বদরের যুদ্ধে বিশেষ এক ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত বিধায় এগুলোর তাফসীর করার ব্যাপারে বিশুদ্ধ ও প্রামাণ্য রেওয়ায়েত ও হাদীসের মাধ্যমে ঘটনাটি বিবৃত করা বাঞ্ছনীয়। ঘটনাটি হল এই যে, বদর যুদ্ধটি ছিল ইসলামের প্রথম জিহাদ। তখনো জিহাদ সংক্রান্ত হুকুম-আহকামের কোন বিস্তারিত বিবরণ কুরআনে নাযিল হয়নি। যেমন, জিহাদ করতে গিয়ে গনীমতের মাল হস্তগত হলে তা কি করতে হবে, শক্রসৈন্য নিজেদের আয়ত্বে এসে গেলে তাকে বন্দী করা জায়েয হবে কিনা এবং বন্দী করে ফেললে তাদের সাথে কেমন আচরণ করতে হবে প্রভৃতি। হাদীসে এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেনঃ "আমাকে এমন পাঁচটি বিষয় দান করা হয়েছে, যা আমার পূর্বে অন্য কোন নবীকে দেয়া হয়নি। সেগুলোর মাঝে এও একটি যে, কাফেরদের সাথে প্রাপ্ত গনীমতের মালামাল কারো জন্য হালাল ছিল না, কিন্তু আমার উম্মতের জন্য তা হালাল করে দেয়া হয়েছে। [ দেখুন- বুখারীঃ ৩৩৫, মুসলিমঃ ৫২১ ] গনীমতের মাল বিশেষভাবে এ উম্মতের জন্য হালাল হওয়ার বিষয়টির ব্যাপারে বদর যুদ্ধের পূর্ব পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর কোন ওহী নাযিল হয়নি। অথচ বদর যুদ্ধে এমন এক পরিস্থিতির উদ্ভব হয় যে, আল্লাহ তা'আলা মুসলিমগণকে ধারণা-কল্পনার বাইরে অসাধারণ বিজয় দান করেন। শক্ররা বহু মালামালও ফেলে যায়, যা গনীমত হিসেবে মুসলিমদের হস্তগত হয় এবং তাদের বড় বড় সত্তর জন সর্দারও মুসলিমদের হাতে বন্দী হয়ে আসে। কিন্তু এতদুভয় বিষয়ের বৈধতা সম্পর্কে কোন ওহী তখনো আসেনি। সে কারণেই সাহাবায়ে কেরামের প্রতি এহেন তড়িৎ পদক্ষেপের দরুন ভর্ৎসনা নাযিল হয়। এই ভৎর্সনা ও অসন্তুষ্টিই এই ওহীর মাধ্যমে ব্যক্ত করা হয়েছে যাতে যুদ্ধবন্দীদের সম্পর্কে বাহ্যতঃ দু’টি অধিকার মুসলিমগণকে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এরই মাঝে এই ইঙ্গিতও করা হয়েছিল যে, বিষয়টির দুটি দিকের মধ্যে আল্লাহ তা'আলার নিকট একটি পছন্দনীয় এবং অপরটি অপছন্দনীয়। সাহাবায়ে কেরামের সামনে এ দুটি বিষয় যখন ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে পেশ করা হল যে, এদেরকে যদি মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়, তবে হয়ত এরা সবাই অথবা এদের কেউ কেউ কোন সময় মুসলিম হয়ে যাবে। আর প্রকৃতপক্ষে এটাই হল জিহাদের উদ্দেশ্য ও মূল উপকারিতা। দ্বিতীয়তঃ এমনও ধারণা করা হয়েছিল যে, এ সময় মুসলিমগণ যখন নিদারুণ দৈন্যাবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন, তখন সত্তর জনের আর্থিক মুক্তিপণ অর্জিত হলে এ কষ্টও কিছুটা লাঘব হতে পারে এবং তা ভবিষ্যতে জিহাদের প্রস্তুতির জন্যও কিছুটা সহায়ক হতে পারে। এসব ধারণার প্রেক্ষিতে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু ও অন্যান্য সাহাবায়ে কেরাম এ মতই প্রদান করলেন যে, বন্দীগণকে মুক্তিপণ নিয়ে মুক্ত করে দেয়া হোক। শুধুমাত্র উমর ইবনুল খাত্তাব ও সাদ ইবন মুআয রাদিয়াল্লাহু আনহুমা প্রমূখ কয়েকজন সাহাবী এ মতের বিরোধিতা করলেন এবং বন্দীদের সবাইকে হত্যা করার পক্ষে মত দান করলেন। তাদের যুক্তি ছিল এই যে, একান্ত সৌভাগ্যক্রমে ইসলামের মোকাবেলায় শক্তি ও সামর্থের বলে যোগদানকারী সমস্ত কুরাইশ সর্দার এখন মুসলিমদের হস্তগত হলেও পরে তাদের ইসলাম গ্রহণ করার বিষয়টি একান্তই কল্পনানির্ভর। কিন্তু ফিরে গিয়ে এরা যে মুসলিমদের বিরুদ্ধে অধিকতর তৎপরতা প্রদর্শন করবে সে ধারণাই প্রবল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যিনি রাহমাতুল্লিল আলামীন হয়ে আগমন করেছিলেন, তিনি সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে দু'টি মত লক্ষ্য করে সে মতটিই গ্রহণ করে নিলেন, যাতে বন্দীদের ব্যাপারে রহমত ও করুণা প্রকাশ পাচ্ছিল এবং বন্দীদের জন্যও ছিল সহজ। অর্থাৎ মুক্তিপণের বিনিময়ে তাদেরকে মুক্ত করে দেয়া। [ দেখুন, সীরাতে ইবন হিশাম; বাগভী; কুরতুবী; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া ] [ ২ ] এ আয়াতে ( حَتّٰی یُثۡخِنَ فِی الۡاَرۡضِ ) বাক্য ব্যবহৃত হয়েছে। ( اِثخان ) এর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে কারো শক্তি ও দম্ভকে ভেঙ্গে দিতে গিয়ে কঠোরতর ব্যবস্থা নেয়া। [ তাবারী; কাশশাফ; ফাতহুল কাদীর ] এর সারার্থ হল এই যে, শক্রর দম্ভকে ধুলিস্মাৎ করে দেন। যাতে বেশীরভাগ স্থানেই মুসলিমদের বিজয় সূচিত হয়। [ আত-তাহরীর ওয়াত তানওয়ীর ] [ ৩ ] আয়াতে সে সমস্ত সাহাবাকে সম্বোধন করা হয়েছে, যারা মুক্তিপণের বিনিময়ে বন্দীদের ছেড়ে দেয়ার পক্ষে মত দিয়েছিলেন। এতে বলা হয়েছে যে, এ ব্যাপারে রাসূলের কোন দোষ নেই। তোমরাই আমার রাসূলকে এ পরামর্শ দান করছে। কারণ, শক্রদের বশে পাওয়ার পরেও তাদের শক্তি ও দম্ভকে চূর্ণ করে না দিয়ে অনিষ্টকর শক্রকে ছেড়ে দিয়ে মুসলিমদের জন্য স্থায়ী বিপদ দাড় করিয়ে দেয়া কোন নবীর পক্ষেই শোভন নয়। যেসব সাহাবী মুক্তিপণ নিয়ে বন্দীদের ছেড়ে দেয়ার পক্ষে মত দিয়েছিলেন, তাদের সে মতে যদিও নির্ভেজাল একটি দ্বনী প্রেরণাও বিদ্যমান ছিল- অর্থাৎ মুক্তি পাবার পর তাদের মুসলিম হয়ে যাবার আশা, কিন্তু সেই সাথে আত্মস্বার্থজনিত অপর একটি দিকও ছিল যে, এতে করে তাদের হাতে কিছু অর্থসম্পদ এসে যাবে। [ আত-তাহরীর ওয়াত তানওয়ীর ]
Tafsir ibn kathir bangla তাফসীর ইবনে কাসীর
৬৭-৬৯ নং আয়াতের তাফসীর: মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, বদরের বন্দীদের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ ( সঃ ) স্বীয় সাহাবীবর্গের সাথে পরামর্শ করেন। তিনি তাদের বলেনঃ “ আল্লাহ তা'আলা এই বন্দীদেরকে তোমাদের অধিকারে দিয়েছেন । বল, তোমাদের ইচ্ছা কি?” উমার ইবনুল খাত্তাব ( রাঃ ) দাঁড়িয়ে গিয়ে বললেনঃ “ হে আল্লাহর রাসূল ( সঃ )! তাদেরকে হত্যা করা হাক ।” রাসূলুল্লাহ ( সঃ ) তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। পুনরায় রাসূলুল্লাহ ( সঃ ) বললেনঃ “ আল্লাহ তাআলা এদেরকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন, এরা কাল পর্যন্তও তোমাদের ভাইই ছিলো ।” উমার ( রাঃ ) দাঁড়িয়ে তাঁর উত্তরের পুনরাবৃত্তি করেন। রাসূলুল্লাহ ( সঃ ) এবারও মুখ ফিরিয়ে নিলেন এবং পুনরায় ঐ কথা বললেন। এবার আবু বকর সিদ্দীক ( রাঃ ) দাড়িয়ে গিয়ে আরয করলেন- “ হে আল্লাহর রাসূল ( সঃ )! আমার মত এই যে, আপনি তাদেরকে ক্ষমা করে দিন এবং তাদের নিকট থেকে মুক্তিপণ আদায় করুন ।” এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ ( সঃ )-এর চেহারা থেকে চিন্তার লক্ষণ, দূরীভূত হয়। তিনি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন এবং মুক্তিপণ নিয়ে সকলকেই মুক্ত করে দেন। তখন মহামহিমান্বিত আল্লাহ এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। এই সূরারই শুরুতে ইবনে আব্বাস ( রাঃ )-এর বর্ণনা বর্ণিত হয়েছে। সহীহ মুসলিমেও এরূপ একটি হাদীস আছে যে, বদরের দিন রাসূলুল্লাহ ( সঃ ) সাহাবীদের জিজ্ঞেস করেনঃ “ এই বন্দীদের ব্যাপারে তোমরা কি চাও?” আবু বকর ( রাঃ ) উত্তরে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল ( সঃ )! এরা তো আপনার কওমের লোক এবং আপনার পরিবারেরই মানুষ । সুতরাং এদেরকে জীবিতই ছেড়ে দেয়া হাক এবং তাওবা করিয়ে নেয়া যাক। এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই যে, হয়তো কাল আল্লাহ এদের উপর দয়া করবেন।” কিন্তু উমার ( রাঃ ) বলেনঃ “ হে আল্লাহর রাসূল ( সঃ )! এরা আপনাকে মিথ্যা প্রতিপন্নকারী এবং আপনাকে দেশ থেকে বিতাড়নকারী । সুতরাং এদের গর্দান উড়িয়ে দেয়ার নির্দেশ দান করুন।” আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা ( রাঃ ) বললেনঃ “ হে আল্লাহর রাসূল ( সঃ )! এ মাঠে বহু খড়ি রয়েছে । এগুলোতে আগুন ধরিয়ে দিন এবং এদেরকে এ আগুনে ফেলে দিয়ে জ্বালিয়ে দিন।” রাসূলুল্লাহ ( সঃ ) এদের কথা শুনে নীরব হয়ে যান। কাউকেও কোন জবাব না দিয়ে উঠে চলে গেলেন। এই তিন মহান ব্যক্তিরই পক্ষ অবলম্বনকারী লোক জুটে গেলেন। এমন সময় রাসূলুল্লাহ ( সঃ ) এসে বলতে লাগলেনঃ কারও কারও অন্তর দুধের চেয়েও নরম হয়ে গেছে এবং কারও কারও হৃদয় পাথরের চেয়েও শক্ত হয়ে গেছে। হে আবূ বকর! তোমার দৃষ্টান্ত হচ্ছে ইবরাহীম ( আঃ )-এর মত। তিনি আল্লাহর নিকট আরয করেছিলেনঃ “ যারা আমার অনুসরণ করেছে তারা তো আমারই লোক, আর যারা আমার অবাধ্য হয়েছে তাদের ব্যাপারেও আপনি ক্ষমাশীল ও দয়ালু ।” হে আবূ বকর! তোমার দৃষ্টান্ত ঈসা ( আঃ )-এর দৃষ্টান্তের ন্যায়ও বটে। যিনি বললেনঃ “ হে আল্লাহ! আপনি যদি তাদেরকে শাস্তি প্রদান করেন তবে তারা আপনার বান্দা, আর যদি তাদেরকে ক্ষমা করে দেন তবে আপনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময় ।” হে উমার! তোমার দৃষ্টান্ত হচ্ছে মূসা ( আঃ )-এর ন্যায়। তিনি বলেছিলেনঃ “ হে আমার প্রতিপালক! তাদের ধন-সম্পদ নিশ্চিহ্ন করে দিন এবং তাদের অন্তর কঠোর করে দিন, সুতরাং তারা ঈমান আনবে না যে পর্যন্ত না তারা বেদনাদায়ক শাস্তি অবলোকন করে ।হে আব্দুল্লাহ! তোমার দৃষ্টান্ত নূহ ( আঃ )-এর ন্যায়ও বটে। তিনি বলেছিলেনঃ “ হে আমার প্রভু! আপনি কাফিরদের মধ্য হতে যমীনের উপর একজনকেও অবশিষ্ট রাখবেন না ।” দেখো, তোমরা এখন দারিদ্রপীড়িত। সুতরাং এই বন্দীদের। কেউই ফিদইয়া প্রদান ছাড়া মুক্তি পেতে পারে না। আর ফিদইয়া না দিলে তাদেরকে হত্যা করা হবে। তখন আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ ( রাঃ ) বললেনঃ “ হে আল্লাহর রাসূল ( সঃ )! এদের থেকে সাহল ইবনে বায়যাকে বিশিষ্ট করে নিন । কেননা, সে ইসলামের আলোচনা করে থাকে।” এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ ( সঃ ) নীরব হয়ে যান। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ ( রাঃ ) বলেনঃ “ আল্লাহর কসম! আমি সারা দিন ভীত-সন্ত্রস্ত থাকলাম যে, না জানি আমার উপর আকাশ থেকে পাথরই বর্ষিত হয় । শেষ পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ ( সঃ ) বলেনঃ “ সাহীল ইবনে বায়যা ব্যতীত ।” তখন আল্লাহ তা'আলা...
( আরবী )-এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন।” ( এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ ) ও ইমাম তিরমিযী ( রঃ ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম হাকিম ( রঃ ) এটাকে তাঁর মুসতাদরিক গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন, আর বলেছেন যে, এর ইসনাদ বিশুদ্ধ এবং তারা দুজন এটাকে তাখরীজ করেননি) এই কয়েদীদের মধ্যে আব্বাস ( রাঃ ) ছিলেন। তাঁকে একজন আনসারী গ্রেফতার করেছিলেন। এই আনসারীর ধরণা ছিল যে, তাঁকে হত্যা করা হবে। রাসূলুল্লাহও ( সঃ ) এ অবস্থা অবগত ছিলেন। তিনি বলেনঃ “ এই চিন্তায় রাত্রে আমার ঘুম হয়নি ।” উমার ( রাঃ ) তাঁকে বললেনঃ “ আপনার অনুমতি হলে আমি এ ব্যাপারে আনসারদের নিকট গমন করি ।” রাসূলুল্লাহ ( সঃ ) তাঁকে অনুমতি দিলেন। সুতরাং উমার ( রাঃ ) আনসারদের নিকট গমন করে বললেনঃ “ আব্বাস ( রাঃ )-কে ছেড়ে দিন । তারা বললেনঃ “ আল্লাহর কসম! আমরা তাকে ছাড়বো না ।” তখন উমার ( রাঃ ) বললেনঃ “ এতেই যদি আল্লাহর রাসূল ( সঃ )-এর সন্তুষ্টি নিহিত থাকে তবুও কি ছাড়বেন না?” তারা তখন বললেনঃ “যদি এটাই হয় তবে আপনি তাঁকে নিয়ে যান । আমরা খুশী মনে তাকে ছেড়ে দিচ্ছি।” উমার ( রাঃ ) আব্বাস ( রাঃ )-কে বললেনঃ “ হে আব্বাস ( রাঃ )! আপনি ইসলাম গ্রহণ করুন । আল্লাহর কসম! আপনার ইসলাম গ্রহণ আমার কাছে। আমার পিতার ইসলাম গ্রহণের চাইতেও বেশী আনন্দের কারণ হবে। কেননা, রাসূলুল্লাহ ( সঃ ) আপনার ইসলাম গ্রহণে খুশী হবেন।” এই সব কয়েদীর ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ ( সঃ ) আবূ বকর ( রাঃ )-এর সাথে পরামর্শ করলেন। তখন তিনি বললেনঃ “ এরা তো আমাদের গোত্রেরই লোক । সুতরাং এদেরকে ছেড়ে দিন।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ ( সঃ ) উমার ( রাঃ )-এর সাথে পরামর্শ করলে তিনি বললেনঃ “ এদের সকলকেই হত্যা করে দিন ।” শেষ পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ ( সঃ ) বন্দীদের কাছে মুক্তিপণ নিয়ে সকলকেই ছেড়ে দেন। আলী ( রাঃ ) বলেন যে, জিবরাঈল ( আঃ ) এসে বলেনঃ “ হে রাসূল ( সঃ )! আপনার সাহাবীদেরকে ইখতিয়ার দিন যে, তারা দুটোর মধ্যে যে কোন একটি গ্রহণ করতে পারেন । হয় তাঁরা মুক্তিপণ নিয়ে বন্দীদেরকে ছেড়ে দিবেন, না হয় তাদেরকে হত্যা করে ফেলবেন। কিন্তু স্মরণ রাখতে হবে যে, মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দেয়া হলে আগামী বছর বন্দীদের সমান সংখ্যক মুসলমান শহীদ হয়ে যাবেন।” সাহাবীগণ বলেন যে, তারা প্রথমটিই গ্রহণ করলেন এবং বন্দীদেরকে মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দিবেন। ( এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ ) ও ইমাম নাসাঈ ( রঃ ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু হাদীসটি অত্যন্ত গারীব ও দুর্বল)এই বদরী বন্দীদের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ ( সঃ ) বলেনঃ “ হে সাহাবীর দল! যদি চাও তবে মুক্তিপণ আদায় করে তাদেরকে ছেড়ে দাও । অথবা ইচ্ছা করলে হত্যা করে দাও। কিন্তু মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দিলে তাদের সমান সংখ্যক তোমাদের লোক শহীদ হয়ে যাবে।” এই সত্তরজন শহীদের মধ্যে সর্বশেষ শহীদ হচ্ছেন সাবিত ইবনে কায়েস ( রাঃ ), যিনি ইয়ামামার যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন। এই রিওয়ায়াতটি মুরসালরূপে উবাইদাহ ( রাঃ ) হতে বর্ণিত আছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ পাকের জ্ঞানই সবচেয়ে বেশী।মহান আল্লাহ বলেনঃ “ আল্লাহর কিতাবে প্রথম থেকেই যদি তোমাদের জন্যে গনীমতের মাল হালাল রূপে লিপিবদ্ধ না করা হতো এবং বর্ণনা করে দেয়ার পূর্বে আমি শাস্তি প্রদান করি না- এটা যদি আমার নীতি না হতো তবে যে ফিদইয়া বা মুক্তিপণ তোমরা গ্রহণ করেছে তার কারণে আমি তোমাদেরকে কঠিন শাস্তি প্রদান করতাম । এভাবেই আল্লাহ তা'আলা ফায়সালা করে রেখেছিলেন যে, কোন বদরী সাহাবীকে তিনি শাস্তি দিবেন না। তাদের জন্যে ক্ষমা লিপিবদ্ধ করে দেয়া হয়েছে। উম্মুল কিতাবে তোমাদের জন্যে গনীমতের মাল হালাল বলে লিখে দেয়া হয়েছে। সুতরাং গনীমতের মাল তোমাদের জন্যে হালাল ও পবিত্র। ইচ্ছামত তোমরা তা খাও, পান কর এবং নিজেদের কাজে লাগাও।" পূর্বেই এটা লিখে দেয়া হয়েছিল যে, এই উম্মতের জন্যে এটা হালাল। এটাই ইবনে জারীর ( রঃ )-এর নিকট পছন্দনীয় উক্তি। আর সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমেও এর সাক্ষ্য মিলে। জাবির ইবনে আবদুল্লাহ ( রাঃ ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ ( সঃ ) বলেছেনঃ “ আমাকে এমন পাঁচটি জিনিস প্রদান করা হয়েছে যা আমার পূর্বে অন্য কোন নবীকে প্রদান করা হয়নি । ( ১ ) এক মাসের পথ পর্যন্ত ভয় ও প্রভাব দ্বারা আমাকে সাহায্য করা হয়েছে। ( ২ ) যমীনকে আমার জন্যে মসজিদ ও পবিত্র বানানো হয়েছে। ( ৩ ) গনীমতের মাল আমার জন্যে হালাল করা হয়েছে যা আমার পূর্বে আর কারো জন্যে হালাল ছিল না। ( ৪ ) আমাকে শাফাআতের অনুমতি দেয়া হয়েছে। ( ৫ ) প্রত্যেক নবীকে বিশেষভাবে তাঁর নিজের কওমের কাছে প্রেরণ করা হতো। কিন্তু আমি সাধারণভাবে সকল মানবের নিকট প্রেরিত হয়েছি।”আবু হুরাইরা ( রাঃ ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ ( সঃ ) বলেছেনঃ “ আমাদের ছাড়া কোন কালো মাথা বিশিষ্ট মানুষের জন্যে গনীমতের মাল হালাল করা হয়নি । এ জন্যেই আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ “ তোমরা যে গনীমতের মাল লাভ করেছো তা হালাল ও পবিত্ররূপে ভক্ষণ কর ।” সাহাবীগণ কয়েদীদের নিকট থেকে মুক্তিপণ আদায় করেছিলেন । সুনানে আবি দাউদে রয়েছে যে, প্রত্যেকের নিকট থেকে চারশ করে আদায় করা হয়েছিল। সুতরাং জমহুরে উলামার মতে প্রতি যুগের ইমামের এ ইখতিয়ার রয়েছে যে, তিনি ইচ্ছা করলে বন্দী কাফিরদেরকে হত্যা করতে পারেন, যেমন রাসূলুল্লাহ ( সঃ ) বানু কুরাইযার বন্দীদেরকে হত্যা করেছিলেন। আর ইচ্ছা করলে মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দিতে পারেন, যেমন রাসূলুল্লাহ ( সঃ ) বদরী বন্দীদেরকে মুক্তিপণের বিনিময়ে আযাদ করে দিয়েছিলেন। আবার ইচ্ছা করলে মুসলমান বন্দীদের বিনিময়ে মুক্ত করে দিতে পারেন, যেমন রাসূলুল্লাহ ( সঃ ) মাসলামা ইবনে আকওয়া গোত্রের একটি স্ত্রীলোক ও তার মেয়েকে মুশরিকদের নিকট বন্দী মুসলমানদের বিনিময়ে তাদেরকে প্রদান করেছিলেন। আর ইচ্ছা করলে ঐ বন্দীদেরকে গোলাম বানিয়ে রাখতে পারে। এটাই ইমাম শাফিঈ ( রঃ ) ও উলামায়ে কিরামের একটি দলের মাযহাব, যদিও অন্যেরা ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। এখানে এর বিস্তারিত আলোচনা করার তেমন কোন সুযোগ নেই।
সূরা আনফাল আয়াত 67 সূরা
| English | Türkçe | Indonesia |
| Русский | Français | فارسی |
| تفسير | Urdu | اعراب |
বাংলায় পবিত্র কুরআনের আয়াত
- ফেরাউন সে ছিল সীমালংঘনকারীদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয়।
- এবং যারা আমার আয়াতসমূহকে ব্যর্থ করার জন্যে চেষ্টা করে, তারাই দোযখের অধিবাসী।
- নিশ্চয় সৎলোকগণ থাকবে পরম আরামে,
- বলুন, তোমরা সত্যবাদী হলে এখন আল্লাহর কাছ থেকে কোন কিতাব আন, যা এতদুভয় থেকে উত্তম
- অতঃপর তোমরা তাদেরকে ঠাট্টার পাত্ররূপে গ্রহণ করতে। এমনকি, তা তোমাদেরকে আমার স্মরণ ভুলিয়ে দিয়েছিল এবং
- সেদিন দয়াময়ের কাছে পরহেযগারদেরকে অতিথিরূপে সমবেত করব,
- কিন্তু যারা এরপর তওবা করে এবং সংশোধিত হয়, আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম মেহেরবান।
- আমাদের প্রথম মৃত্যু ছাড়া এবং আমরা শাস্তি প্রাপ্তও হব না।
- অতঃপর এসব নিদর্শন দেখার পর তারা তাকে কিছুদিন কারাগারে রাখা সমীচীন মনে করল।
- আমি তোমাদের জন্যে তাতে জীবিকার উপকরন সৃষ্টি করছি এবং তাদের জন্যেও যাদের অন্নদাতা তোমরা নও।
বাংলায় কোরআনের সূরা পড়ুন :
সবচেয়ে বিখ্যাত কোরআন তেলাওয়াতকারীদের কণ্ঠে সূরা আনফাল ডাউনলোড করুন:
সূরা Anfal mp3 : উচ্চ মানের সাথে সম্পূর্ণ অধ্যায়টি Anfal শুনতে এবং ডাউনলোড করতে আবৃত্তিকারকে বেছে নিন
আহমেদ আল-আজমি
ইব্রাহীম আল-আখদার
বান্দার বেলাইলা
খালিদ গালিলি
হাতেম ফরিদ আল ওয়ার
খলিফা আল টুনাইজি
সাদ আল-গামদি
সৌদ আল-শুরাইম
সালাহ বুখাতীর
আবদ এল বাসেট
আবদুল রশিদ সুফি
আব্দুল্লাহ্ বাস্ফার
আবদুল্লাহ আল-জুহানী
আলী আল-হুদায়েফি
আলী জাবের
ফারেস আব্বাদ
মাহের আলমাইকুলই
মোহাম্মদ আইয়ুব
মুহাম্মদ আল-মুহাইসনি
মুহাম্মাদ জিব্রীল
আল-মিনশাবি
আল হোসারি
মিশারী আল-আফসী
নাসের আল কাতামি
ইয়াসের আল-দোসারি
Please remember us in your sincere prayers



