কোরান সূরা লাহাব আয়াত 1 তাফসীর
﴿تَبَّتْ يَدَا أَبِي لَهَبٍ وَتَبَّ﴾
[ المسد: 1]
আবু লাহাবের হস্তদ্বয় ধ্বংস হোক এবং ধ্বংস হোক সে নিজে, [সূরা লাহাব: 1]
Surah Al-Masad in Banglaজহুরুল হক সূরা বাংলা Surah Masad ayat 1
ধ্বংস হোক আবু লহবের উভয় হাত, আর সে-ও ধ্বংস হোক!
Tafsir Mokhtasar Bangla
১. নবী ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ) এর চাচা আবু লাহাবের হস্তদ্বয় ধ্বংস হয়েছে। নবী ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াল্লাম ) কে কষ্ট দেয়ার মতো তার মন্দ আমলের কারণে এবং তার প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হয়েছে।
Tafsir Ahsanul Bayan তাফসীরে আহসানুল বায়ান
ধ্বংস হোক আবু লাহাবের হস্তদ্বয় এবং ধ্বংস হোক সে নিজেও। [১] [১] يَدَا শব্দটি يَدٌ এর দ্বিবচন। অর্থ হল দুই হাত। এ থেকে উদ্দেশ্য হল তার সত্তা বা দেহ। এই আংশিক অর্থবোধক শব্দ ব্যবহার করে সমষ্টিগত অর্থ নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, সে নিজে ধ্বংস হয়ে যাক। এই বদ্দুআটি সেই বদ্দুআর জওয়াবে বলা হয়েছে, যা আবু লাহাব মহানবী ( সাঃ )-এর প্রতি রাগ ও শত্রুতাবশে করেছিল। تَبَّ শব্দের অর্থ হল ধ্বংস ও বরবাদ হয়েছে। অর্থাৎ, সে ধ্বংস হয়েছে। ( অতীত কালকে দু'আর অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। ) অথবা এটা হল খবর। বদ্দুআর সাথে সাথেই মহান আল্লাহ তার ধ্বংস ও বরবাদ হওয়ার খবর ঘোষণা করেছেন। সুতরাং বদর যুদ্ধের কয়েক দিন পরেই সে এক প্রকার চর্মরোগে আক্রান্ত হল; যে রোগে দেহে প্লেগের মত গুটলি প্রকাশ পায়। এই রোগই তাকে মৃত্যুর গ্রাস বানালো। তিন দিন পর্যন্ত তার লাশ এমনিই পড়ে ছিল। পরিশেষে তা খুবই দুর্গন্ধময় হয়ে উঠল। অতঃপর ব্যাধি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় এবং মান-সম্মানের ভয়ে তার ছেলেরা তাকে দূর থেকে পাথর ও মাটি ঢেলে দেহটাকে দাফন করে দিল। ( আইসারুত তাফাসীর )
Tafsir Abu Bakr Zakaria bangla কিং ফাহাদ কুরআন প্রিন্টিং কমপ্লেক্স
ধ্বংস হোক আবু লাহাবের [ ১ ] দু‘হাত [ ২ ] এবং ধ্বংস হয়েছে সে নিজেও। সূরা সম্পর্কিত তথ্যঃ হাদীসে এসেছে, আল্লাহ্র বাণী وَاَنْذِرْعَشِيْرَ تَكَ الْاَقْرَ بِيْنَ “ আর আপনি আপনার গোত্রের নিকটাত্মীয়দেরকে ভীতি প্রদর্শন করুন” [ সূরা আশ-শু‘আরা: ২১৪ ] এ আয়াতটি অবতীর্ণ হলে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাফা পর্বতে আরোহণ করে কোরাইশ গোত্রের উদ্দেশ্যে وَا صَبَاحَاه ( ‘হায়! সকাল বেলার বিপদ’ ) বলে অথবা আবদে মানাফ ও আবদুল মোত্তালিব ইত্যাদি নাম সহকারে ডাক দিলেন । ( এভাবে ডাক দেয়া তখন আরবে বিপদাশঙ্কার লক্ষণরূপে বিবেচিত হত ) ডাক শুনে কোরাইশ গোত্র পর্বতের পাদদেশে একত্রিত হল। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: যদি আমি বলি যে, একটি শত্রুদল ক্রমশই এগিয়ে আসছে এবং সকাল বিকাল যে কোন সময় তোমাদের ওপর ঝাপিয়ে পড়বে, তবে তোমরা আমার কথা বিশ্বাস করবে কি? সবাই একবাক্যে বলে উঠল: হ্যাঁ, অবশ্যই বিশ্বাস করব। অতঃপর তিনি বললেন: আমি ( শিরক ও কুফরের কারণে আল্লাহ্র পক্ষ থেকে নির্ধারিত ) এক ভীষণ আযাব সম্পর্কে তোমাদেরকে সতর্ক করছি। এ কথা শুনে আবু লাহাব বলল, تَبًا لَكَ أَلِهٰذَا جِمَعْتَنَا ‘ধ্বংস হও তুমি, এজন্যেই কি আমাদেরকে একত্রিত করেছ’? অতঃপর সে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে পাথর মারতে উদ্যত হল। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সূরা লাহাব অবতীর্ণ হয়। [ বুখারী: ৪৯৭১,৪৯৭২, মুসলিম:২০৮ ] [ ১ ] আবু লাহাবের আসল নাম ছিল আবদুল উযযা। সে ছিল আবদুল মুত্তালিবের অন্যতম সন্তান। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচা। গৌরবর্ণের কারণে তার ডাক নাম হয়ে যায় আবু লাহাব। কারণ, ‘লাহাব’ বলা হয় আগুণের লেলিহান শিখাকে। লেলিহান শিখার রং হচ্ছে গৌরবর্ণ। সে অনুসারে আবু লাহাব অর্থ, গৌরবর্ণবিশিষ্ট। পবিত্র কুরআন তার আসল নাম বর্জন করেছে। কারণ, সেটা মুশরিকসুলভ। এছাড়া আবু লাহাব ডাক নামের মধ্যে জাহান্নামের সাথে বেশ মিলও রয়েছে। কারণ, জাহান্নামের অগ্নির লেলিহান শিখা তাকে পাকড়াও করবে। সে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কট্টর শত্রু ও ইসলামের ঘোর বিরোধী ছিল। সে নানাভাবে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে কষ্ট দেয়ার প্রয়াস পেত। তিনি যখন মানুষকে ঈমানের দাওয়াত দিতেন, তখন সে সাথে সাথে গিয়ে তাকে মিথ্যাবাদী বলে প্রচার করত। রবী‘আ ইবনে আব্বাদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জাহিলিয়াতের ( অন্ধকার ) যুগে যুল-মাজায বাজারে দেখলাম, তিনি বলছিলেন, “ হে মানব সম্প্রদায়! তোমরা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্ বল, সফলকাম হবে” । আর মানুষ তার চতুস্পার্শে ভীড় জমাচ্ছিল। তার পিছনে এক গৌরবর্ণ টেরা চোখবিশিষ্ট সুন্দর চেহারার লোক বলছিল, এ লোকটি ধর্মত্যাগী, মিথ্যাবাদী। এ লোকটি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পিছনে পিছনে যেখানে তিনি যেতেন সেখানেই যেত। তারপর আমি লোকদেরকে এ লোকটি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। লোকেরা বলল, এটি তারই চাচা আবু লাহাব।” [ মুসনাদে আহমাদ: ৪/৩৪১ ] অন্য বর্ণনায়, রবী‘আ ইবনে আব্বাদ বলেন, আমি আমার পিতার সাথে ছিলাম। আমি যেন দেখতে পাচ্ছি কিভাবে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিভিন্ন গোত্রের কাছে নিজেকে পেশ করে বলছিলেন, “ হে অমুক বংশ! আমি তোমাদের সবার নিকট আল্লাহ্র রাসূল । তোমাদেরকে আল্লাহ্র ইবাদত করতে এবং তার সাথে কাউকে শরীক না করতে নির্দেশ দিচ্ছি। আর আমি এটাও চাই যেন তোমরা সত্য বলে বিশ্বাস কর এবং আমার পক্ষ থেকে প্রতিরোধ কর, যাতে করে আমি আমার আল্লাহ্র কাছ থেকে যা নিয়ে প্রেরিত হয়েছি তা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে পারি।” যখনই তিনি এ কথাগুলো বলে শেষ করতেন তখনই তার পিছন থেকে এক লোক বলত: হে অমুক বংশ! সে তোমাদেরকে লাত ও উযযা থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চায়- সে নতুন কথা চালু করেছে, সে ভ্ৰষ্টতা নিয়ে এসেছে। সুতরাং তোমরা তার কথা শোনবে না এবং তার অনুসরণ করবে না। তখন আমি আমার পিতাকে বললাম, এ লোকটি কে ? তিনি বললেন, ঐ লোকটির চাচা আবু লাহাব। [ মুসনাদে আহমাদ: ৩/৪৯২ ] [ ফাতহুল কাদীর, ইবন কাসীর ] [ ২ ] يد শব্দের অর্থ হাত। মানুষের সব কাজে হাতের প্রভাবই বেশি, তাই কোন ব্যক্তির সত্তাকে হাত বলেই ব্যক্ত করে দেয়া হয়; যেমন কুরআনের অন্যত্র بِمَا قَدَّ مَتْ يَدٰكَ বলা হয়েছে। تَبَّتْ يَدَٓ ااَبِىْ لَهَبٍ এর অর্থ কোন তাফসীরকার করেছেন, “ ভেঙে যাক আবু লাহাবের হাত” এবং وتبّ শব্দের মানে করেছেন, “সে ধ্বংস হয়ে যাক” অথবা “সে ধ্বংস হয়ে গেছে ।” কোন কোন তাফসীরকার বলেন, এটা আবু লাহাবের প্রতি একটি ভবিষ্যদ্বাণী। এখানে ভবিষ্যতে যে ঘটনাটি ঘটবে তাকে অতীত কালের অর্থ প্রকাশক শব্দের সাহায্যে বর্ণনা করা হয়েছে। এর মানে, তার হওয়াটা যেন এত বেশী নিশ্চিত যেমন তা হয়ে গেছে। আর যা এ সূরায় কয়েক বছর আগে বর্ণনা করা হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত তাই সত্য হলো। এখানে হাত ভেঙে যাওয়ার মানে শুধু শরীরের একটি অংগ যে হাত সেটি ভেঙে যাওয়াই নয়। বরং কোন ব্যক্তি যে উদ্দেশ্য সম্পন্ন করার জন্য তার সর্বশক্তি নিয়োগ করে তাতে পুরোপুরি ও চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়ে যাওয়াই এখানে বুঝানো হয়েছে। [ কুরতুবী, ফাতহুল কাদীর ] আর আবু লাহাব রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দাওয়াতকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য যথার্থই নিজের সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিল। কিন্তু এ সূরাটি নাযিল হবার মাত্র সাত আট বছর পরেই বদরের যুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয়। এ যুদ্ধে কুরাইশদের অধিকাংশ বড় বড় সরদার নিহত হয়। তারা সবাই ইসলাম বিরোধিতা ও ইসলামের প্রতি শত্রুতার ক্ষেত্রে আবু লাহাবের সহযোগী ছিল। এ পরাজয়ের খবর মক্কায় পৌছার পর সে যত বেশী মর্মাহত হয় যে, এরপর সে সাত দিনের বেশী জীবিত থাকতে পারেনি। যে দ্বীনের অগ্রগতির পথ রোধ করার জন্য সে তার সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিল তার সন্তানদের সেই দ্বীন গ্ৰহণ করার মধ্য দিয়ে তার আরো বেশী ও পূর্ণ পরাজয় সম্পন্ন হয়। সর্বপ্রথম তার মেয়ে দাররা হিজরত করে মক্কা থেকে মদীনায় চলে যান এবং ইসলাম গ্ৰহণ করেন। আর মক্কা বিজয়ের পর তার দুই ছেলে উতবা ও মু‘আত্তাব রাসূলুল্লাহ্র সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সামনে হাযির হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তার হাতে বাইআত করেন। [ রুহুল মা‘আনী ]
Tafsir ibn kathir bangla তাফসীর ইবনে কাসীর
১-৫ নং আয়াতের তাফসীরসহীহ বুখারীতে হযরত ইবনে আব্বাস ( রাঃ ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম ( সঃ ) বাতহা’ নামক স্থানে গিয়ে একটি পাহাড়ের উপর আরোহণ করলেন এবং উচ্চস্বরে “ ইয়া সাবা’হাহ্, ইয়া সাবা’হা'হ্” ( অর্থাৎ হে ভোরের বিপদ, হে ভোরের বিপদ ) বলে ডাক দিতে শুরু করলেন । অল্পক্ষণের মধ্যেই সমস্ত কুরায়েশ নেতা সমবেত হলো। রাসূলুল্লাহ ( সঃ ) তাদেরকে বললেনঃ “ যদি আমি তোমাদেরকে বলি যে, সকালে অথবা সন্ধ্যাবেলায় শত্রুরা তোমাদের উপর আক্রমণ চালাবে তবে কি তোমরা আমার কথা বিশ্বাস করবে?” সবাই সমস্বরে বলে উঠলোঃ “হ্যা হ্যা অবশ্যই বিশ্বাস করবো ।” তখন তিনি তাদেরকে বললেনঃ “ শোননা, আমি তোমাদেরকে আল্লাহর ভয়াবহ শাস্তির আগমন সংবাদ দিচ্ছি ।" আবু লাহাব তার একথা শুনে বললোঃ “ তোমার সর্বনাশ হোক, একথা বলার জন্যেই কি তুমি আমাদেরকে সমবেত করেছো?” তখন আল্লাহ তা'আলা এ সূরা অবতীর্ণ করেন । অন্য এক রিওয়াইয়াতে আছে যে, আবু লাহাব হাত ঝেড়ে নিম্ন লিখিত বাক্য বলতে বলতে চলে গেলঃ ( আরবি ) অর্থাৎ “ তোমার প্রতি সারাদিন অভিশাপ বর্ষিত হোক ।” আবূ লাহাব ছিল রাসূলুল্লাহর ( সঃ ) চাচা। তার নাম ছিল আবদুল উযযা ইবনে আবদিল মুত্তালিব। তার কুনইয়াত বা ছদ্ম পিতৃপদবীযুক্ত নাম আবূ উত্মাহ ছিল। তার সুদর্শন ও কান্তিময় চেহারার জন্যে তাকে আবু লাহাব অর্থাৎ শিখা বিশিষ্ট বলা হতো। সে ছিল রাসূলুল্লাহ ( সঃ )-এর নিকৃষ্টতম শক্র। সব সময় সে তাকে কষ্ট দেয়ার জন্যে এবং তার ক্ষতি সাধনের জন্যে সচেষ্ট থাকতো। হযরত রাবীআহ ইবনে ইবাদ দাইলী ( রাঃ ) তার ইসলাম গ্রহণের পর তাঁর ইসলাম পূর্ব যুগের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেনঃ “ আমি নবী করীম ( সঃ ) কে যুল মাজায এর বাজারে দেখেছি, সে সময় তিনি বলছিলেনঃ “হে লোক সকল! তোমরা বলঃ আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই, তাহলে তোমরা মুক্তি ও কল্যাণ লাভ করবে ।” বহু লোক তাঁকে ঘিরে রেখেছিল। আমি লক্ষ্য করলাম যে, রাসূলুল্লাহ ( সঃ )-এর পিছনেই গৌরকান্তি ও সুডোল দেহ-সৌষ্ঠবের অধিকারী একটি লোক, যার মাথার চুল দুপাশে সিঁথি করা, সে এগিয়ে গিয়ে সমবেত লোকদের উদ্দেশ্যে বললোঃ “ হে লোক সকল! এ লোক বে-দ্বীন ও মিথ্যাবাদী ।” মোটকথা রাসূলুল্লাহ ( সঃ ) ইসলামের দাওয়াত দিয়ে যাচ্ছিলেন, আর সুদর্শন এই লোকটি তার বিরুদ্ধে বলতে বলতে যাচ্ছিল। আমি লোকদেরকে জিজ্ঞেস করলামঃ এ লোকটি কে? উত্তরে তারা বললোঃ “ এ লোকটি হলো রাসূলুল্লাহর ( সঃ ) চাচা আবু লাহাব ।” ( এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)অন্য এক রিওয়াইয়াতে আছে যে, রাবীআ'হ্ ( রাঃ ) বলেনঃ “ আমি আমার পিতার সাথে ছিলাম, আমার তখন যৌবন কাল । আমি দেখেছি যে, রাসূলুল্লাহ ( সঃ ) এক একটি লোকের কাছে যাচ্ছেন আর লোকেদেরকে বলছেনঃ “ হে লোক সকল! আমি তোমাদের নিকট আল্লাহর রাসূল রূপে প্রেরিত হয়েছি । আমি তোমাদেরকে বলছি যে, তোমরা এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর ইবাদত করবে, তার সাথে কাউকে শরীক করবে না। তোমরা আমাকে সত্যবাদী বলে বিশ্বাস করো এবং আমাকে শত্রুদের কবল হতে রক্ষা করো, তাহলে আল্লাহ তাআলা আমাকে যে কাজের জন্যে প্রেরণ করেছেন সে কাজ আমি করতে পারবো।” রাসূলুল্লাহ ( সঃ ) যেখানেই এ পয়গাম পৌছাতেন, পরক্ষণেই আবু লাহাব সেখানে পৌছে বলতোঃ “ হে অমুক গোত্রের লোকেরা! এ ব্যক্তি তোমাদেরকে লাত, উয্যা থেকে দূরে সরাতে চায় এবং বানু মালিক ইবনে আকইয়াসের ধর্ম থেকে তোমাদেরকে ফিরিয়ে দেয়াই তার উদ্দেশ্য । সে নিজের আনীত গুমরাহীর প্রতি তোমাদেরকেও টেনে নিতে চায়। সাবধান! তার কথা বিশ্বাস করো না।”আল্লাহ তাআলা এ সূরায় বলছেনঃ আবু লাহাবের দুই হস্ত ধ্বংস হোক! না তার ধন-সম্পদ তার কোন কাজে এসেছে, না তার উপার্জন তার কোন উপকার করেছে।হযরত ইবনে মাসউদ ( রাঃ ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ ( সঃ ) যখন তার। স্বজাতিকে আল্লাহর পথে আহ্বান জানালেন তখন আবু লাহাব বলতে লাগলোঃ “ যদি আমার ভাতিজার কথা সত্য হয় তবে আমি কিয়ামতের দিন আমার ধন সম্পদ আল্লাহকে ফিদিয়া হিসেবে দিয়ে তার আযাব থেকে আত্মরক্ষা করবো ।" আল্লাহ তাআলা তখন এ আয়াত অবতীর্ণ করেন যে, তার ধন সম্পদ ও তার উপার্জন তার কোন কাজে আসেনি।এরপর মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ অচিরে সে দগ্ধ হবে লেলিহান অগ্নিতে এবং তার স্ত্রীও। অর্থাৎ আবু লাহাব তার স্ত্রীসহ জাহান্নামের ভয়াবহ আগুনে প্রবেশ করবে। আবু লাহাবের স্ত্রী ছিল কুরায়েশ নারীদের নেত্রী। তার কুনিয়াত ছিল উম্মু জামীল, নাম ছিল আরওয়া বিনতু হারব ইবনে উমাইয়া। সে আবূ সুফিয়ান ( রাঃ ) এর বোন ছিল। তার স্বামীর কুফরী, হঠকারিতা এবং ইসলামের শত্রুতায় সে ছিল সহকারিণী, সহযোগিণী। এ কারণে কিয়ামতের দিন সেও স্বামীর সঙ্গে আল্লাহর আযাবে পতিত হবে। কাঠ বহন করে নিয়ে সে তা ঐ। আগুনে নিক্ষেপ করবে যে আগুনে তার স্বামী জ্বলবে। তার গলায় থাকবে আগুনের পাকানো রশি।আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যে ইন্ধন বহন করে, তার গলদেশে পাকানো রঞ্জু। অর্থাৎ সে স্বামীর ইন্ধন সগ্রহ করতে থাকবে।( আরবি ) এর ‘গীবতকারিণী' অর্থও করা হয়েছে। ইমাম ইবনে জারীর ( রঃ ) এ অর্থই পছন্দ করেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস ( রাঃ ) প্রমুখ গুরুজন বর্ণনা করেছেন যে, আবু লাহাবের স্ত্রী জঙ্গল থেকে কাটাযুক্ত কাঠ কুড়িয়ে আনতে এবং ঐ কাঠ রাসূলুল্লাহর চলার পথে বিছিয়ে দিতো। এটাও বলা হয়েছে যে, এ নারী রাসুলুল্লাহকে ভিক্ষুক বলে তিরস্কার করতো। এ কারণে তাকে কাষ্ঠ বহনের পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু প্রথমোক্ত কথাই নির্ভুল। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। সাঈদ ইবনে মুসাইয়াব ( রঃ ) বলেন যে, আবু লাহাবের স্ত্রীর কাছে একটি সুন্দর গলার মালা ছিল সে বলতোঃ “ আমি এ মালা বিক্রী করে তা মুহাম্মদ ( সঃ )-এর বিরোধিতায় ব্যয় করবো । এরই পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, তার গলদেশে থাকবে পাকানো রঞ্জু। অর্থাৎ তার গলদেশে আগুনের বেড়ী পরিয়ে দেয়া হবে। ( আরবি ) শব্দের অর্থ হলো খেজুর গাছের আঁশের রশি। উরওয়া ( রঃ ) বলেন যে, এটা হলো জাহান্নামের শিকল, যার এক একটি কড়া সত্তর গজের হবে। সওরী ( রঃ ) বলেন যে, এটা জাহান্নামের শিকল, যা সত্তর হাত লম্বা। জওহরী ( রঃ ) বলেন যে, এটা উটের চামড়া এবং পশম দিয়ে তৈরি করা হয়। মুজাহিদ ( রঃ ) বলেন যে, এটা লোহার বেড়ী বা শিকল।।হযরত আয়েশা ( রাঃ ) বলেনঃ “ এ সূরা অবতীর্ণ হওয়ার পর ধাঙ্গড় নারী উম্মু জামীল বিনতু হারব নিজের হাতে কারুকার্য খচিত, রং করা পাথর নিয়ে কবিতা আবৃত্তির সূরে নিম্নলিখিত কথাগুলো বলতে বলতে রাসূলুল্লাহর নিকট আগমন করেঃ( আরবি )অর্থাৎ “আমি মুযাম্মামের ( নিন্দনীয় ব্যক্তির ) অস্বীকারকারিণী, তার দ্বীনের দুশমন এবং তার হুকুম অমান্যকারিণী ।" রাসূলুল্লাহ ( সঃ ) ঐ সময় কা'বা গৃহে বসেছিলেন। তাঁর সাথে আমার আব্বা হযরত আবু বকর ( রাঃ ) ছিলেন। আমার আব্বা তাকে এ অবস্থায় দেখে রাসূলুল্লাহ ( সঃ ) কে বললেনঃ “ হে আল্লাহর রাসূল ( সঃ )! সে আসছে, আপনাকে আবার দেখে না ফেলে!” রাসূলুল্লাহ ( সঃ ) তখন বললেনঃ “হে আবু বকর ( রাঃ )! নিশ্চিন্ত থাকো, সে আমাকে দেখতে পাবেই না । তারপর তিনি ঐ দুষ্টা নারীকে এড়ানোর উদ্দেশ্যে কুরআন তিলাওয়াত শুরু করলেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ( আরবি )অর্থাৎ ‘যখন তুমি কুরআন পাঠ কর তখন আমি তোমার মধ্যে এবং যারা পরকালে বিশ্বাস করে না তাদের মধ্যে গোপন পর্দা টেনে দিই।" ( ১৭:৪৫ ) ডাইনী নারী হযরত আবু বকরের ( রাঃ ) কাছে এসে দাড়ালো। রাসূলুল্লাহও ( সঃ ) তখন হযরত আবু বকর ( রাঃ )-এর পাশেই ছিলেন। কিন্তু কুদরতী পর্দা তার চোখের সামনে পড়ে গেল। সুতরাং সে আল্লাহর রাসূল ( সঃ ) কে দেখতে পেলো না। ডাইনী নারী হযরত আবু বকর ( রাঃ ) কে বললোঃ “ আমি শুনেছি যে, তোমার সাথী ( সঃ ) আমার দুর্নাম করেছে অর্থাৎ কবিতার ভাষায় আমার বদনাম ও নিন্দে করেছে । হযরত আবু বকর ( রাঃ ) বললেনঃ “ কা’বার প্রতিপালকের শপথ! রাসূলুল্লাহ ( সঃ ) তোমার কোন নিন্দে করেননি ।” আবু লাহাবের স্ত্রী তখন ফিরে যেতে যেতে বললোঃ “ কুরায়েশরা জানে যে, আমি তাদের সর্দারের মেয়ে ।”একবার এ দুষ্টা রমনী নিজের লম্বা চাদর গায়ে জড়িয়ে তাওয়াফ করছিল, হঠাৎ পায়ে চাদর জড়িয়ে পিছনে পড়ে গেল। তখন বললোঃ “ মুযাম্মাম ধ্বংস হোক ।” তখন উম্ম হাকীম বিনতু আবদিল মুত্তালিব বললোঃ “ আমি একজন পূত পবিত্র রমনী । আমি মুখের ভাষা খারাপ করবো না। আমি বন্ধুত্ব স্থাপনকারিণী, কাজেই আমি কলঙ্কিনী হবো না এবং আমরা সবাই একই দাদার সন্তান, আর কুরায়েশরাই এটা সবচেয়ে বেশী জানে।” আবু বকর বার ( রঃ ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত ইবনে আব্বাস ( রাঃ ) বলেনঃ যখন( আরবি ) এ সূরাটি অবতীর্ণ হয়। তখন আবু লাহাবের স্ত্রী রাসূলুল্লাহ ( সঃ ) এর নিকট আগমন করে। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ ( সঃ ) বসেছিলেন এবং তার সাথে হযরত আবু বকরও ( রাঃ ) ছিলেন। হযরত আবু বকর ( রাঃ ) বললেনঃ “ হে আল্লাহর রাসূল ( সঃ )! ঐ যে সে আসছে, আপনাকে সে কষ্ট দেয় । না কি!” তখন রাসূলুল্লাহ ( সঃ ) বললেনঃ “ তুমি নিশ্চিন্ত থাকো, সে আমাকে দেখতে পাবে না ।” অতঃপর আবু লাহাবের স্ত্রী হযরত আবু বকর ( রাঃ ) কে বললোঃ “ তোমার সাথী ( কবিতার ভাষায় ) আমার দুর্নাম রটনা করেছে ।” হযরত আবু বকর ( রাঃ ) তখন কসম করে বললেমঃ “ রাসূলুল্লাহ ( সঃ ) কাব্য চর্চা করতে জানেন না এবং তিনি কবিতা কখনো বলেননি ।” দুষ্টা নারী চলে যাওয়ার পর হযরত আবু বকর ( রাঃ ) রাসূলুল্লাহ ( সঃ ) কে বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল ( সঃ )! সে কি আপনাকে দেখতে পায়নি?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ ( সঃ ) বললেনঃ “ তার চলে যাওয়া পর্যন্ত ফেরেশতা আমাকে আড়াল করে দাঁড়িয়েছিলেন । কোন কোন পণ্ডিত ব্যক্তি বলেছেন যে, উম্মু জামীলের গলায় আগুনের রশি লাগিয়ে দেয়া হবে এবং ঐ রশি ধরে টেনে তাকে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে, তারপর রশি ঢিলে করে তাকে জাহান্নামের গভীর তলদেশে নিক্ষেপ করা হবে এ শাস্তিই তাকে ক্রমাগতভাবে দেয়া হবে।ঢোলের রশিকে আরবের লোকেরা ( আরবি ) বলতো। আরবী কবিতায় এ শব্দটি এ অর্থেই ব্যবহৃত হতো। একটা কথা মনে রাখতে হবে যে, এ সূরা আমাদের প্রিয় নবী ( সঃ )-এর নবুওয়াতের একটি উচ্চতর প্রমাণ। আবু লাহাব এবং তার স্ত্রী দুস্কৃতির এবং পরিণতির যে সংবাদ এ সূরায় দেয়া হয়েছে। বাস্তবেও তা-ই ঘটেছে। এ দম্পতির ঈমান আনয়নের সৌভাগ্য হয়নি। তারা প্রকাশ্য বা গোপনীয় কোনভাবেই মুসলমান হয়নি। কাজেই, এ সূরাটি রাসূলুল্লাহর ( সঃ ) নবুওয়াতের উজ্জ্বল ও সুস্পষ্ট প্রমাণ।
সূরা লাহাব আয়াত 1 সূরা
| English | Türkçe | Indonesia |
| Русский | Français | فارسی |
| تفسير | Urdu | اعراب |
বাংলায় পবিত্র কুরআনের আয়াত
- তারা কি সে দিকেই তাকিয়ে রয়েছে যে, মেঘের আড়ালে তাদের সামনে আসবেন আল্লাহ ও ফেরেশতাগণ
- অতঃপর তাদের কর্মের শাস্তি আস্বাদন করল এবং তাদের কর্মের পরিণাম ক্ষতিই ছিল।
- আমি প্রত্যেকের জন্যেই দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছি এবং প্রত্যেককেই সম্পুর্ণরূপে ধ্বংস করেছি।
- অতঃপর অচিরেই জানতে পারবে-লাঞ্ছনাজনক আযাব কার উপর আসে এবং চিরস্থায়ী আযাব কার উপর অবতরণ করে।
- তারা কি নির্ভীক হয়ে গেছে এ বিষয়ে যে, আল্লাহর আযাবের কোন বিপদ তাদেরকে আবৃত করে
- তবে কেউ ছোঁ মেরে কিছু শুনে ফেললে জ্বলন্ত উল্কাপিন্ড তার পশ্চাদ্ধাবন করে।
- সহজাত শক্তিসম্পন্ন, সে নিজ আকৃতিতে প্রকাশ পেল।
- তোমরা কি আশ্চর্যবোধ করছ যে, তোমাদের কাছে তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে তোমাদের মধ্য থেকেই একজনের
- আপনি কি তাকে দেখেন না, যে তারা প্রবৃত্তিকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করে? তবুও কি আপনি তার
- পরম কল্যাণময় তিনি যিনি তাঁর বান্দার প্রতি ফয়সালার গ্রন্থ অবর্তীণ করেছেন, যাতে সে বিশ্বজগতের জন্যে
বাংলায় কোরআনের সূরা পড়ুন :
সবচেয়ে বিখ্যাত কোরআন তেলাওয়াতকারীদের কণ্ঠে সূরা লাহাব ডাউনলোড করুন:
সূরা Masad mp3 : উচ্চ মানের সাথে সম্পূর্ণ অধ্যায়টি Masad শুনতে এবং ডাউনলোড করতে আবৃত্তিকারকে বেছে নিন
আহমেদ আল-আজমি
ইব্রাহীম আল-আখদার
বান্দার বেলাইলা
খালিদ গালিলি
হাতেম ফরিদ আল ওয়ার
খলিফা আল টুনাইজি
সাদ আল-গামদি
সৌদ আল-শুরাইম
সালাহ বুখাতীর
আবদ এল বাসেট
আবদুল রশিদ সুফি
আব্দুল্লাহ্ বাস্ফার
আবদুল্লাহ আল-জুহানী
আলী আল-হুদায়েফি
আলী জাবের
ফারেস আব্বাদ
মাহের আলমাইকুলই
মোহাম্মদ আইয়ুব
মুহাম্মদ আল-মুহাইসনি
মুহাম্মাদ জিব্রীল
আল-মিনশাবি
আল হোসারি
মিশারী আল-আফসী
নাসের আল কাতামি
ইয়াসের আল-দোসারি
Please remember us in your sincere prayers



