মুমিনরা তো পরস্পর ভাই-ভাই। অতএব, তোমরা তোমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে মীমাংসা করবে এবং আল্লাহকে ভয় করবে-যাতে তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হও।
📜
অনুবাদ — Tafsir
কয়েকটি শব্দের অর্থ:
إِنَّمَا: নিশ্চয়ই, শুধুমাত্র।
إِخْوَةٌ: ভাই, সহোদর (এখানে ধর্মীয় ভ্রাতৃত্ব বোঝানো হয়েছে)।
فَأَصْلِحُوا: তোমরা মীমাংসা করে দাও, সংশোধন করো।
أَخَوَيْكُمْ: তোমাদের দুই ভাই (অর্থাৎ পরস্পর বিবদমান দুই পক্ষ)।
وَاتَّقُوا اللَّهَ: তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং তাঁর অবাধ্যতা থেকে বাঁচো।
لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ: যাতে তোমাদের ওপর রহমত বর্ষিত হয়।
তাফসির (ব্যাখ্যা):
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা মুমিনদের মধ্যে প্রকৃত ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেছেন, নিশ্চয়ই সব মুমিন পরস্পর ভাই। এই ভ্রাতৃত্ব শুধু রক্তের সম্পর্কের ভিত্তিতে নয়, বরং ঈমান ও ইসলামের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার কারণে। যেহেতু তারা পরস্পর ভাই, তাই তাদের কর্তব্য হলো নিজেদের মধ্যে কোনো মতবিরোধ, ঝগড়া বা সংঘর্ষ হলে তা মিটমাট করা। বিশেষ করে যখন দুই মুমিন গোষ্ঠী বা দুই ব্যক্তি পরস্পর বিবাদে লিপ্ত হয়, তখন অন্য মুমিনদের উচিত তাদের মধ্যে শান্তি স্থাপন করা এবং ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে মীমাংসা করে দেওয়া। এরপর আল্লাহ তায়ালা মুমিনদেরকে তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছেন, অর্থাৎ তাঁর আদেশ পালন ও নিষেধ থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে নিজেদেরকে রক্ষা করার নির্দেশ দিয়েছেন। কারণ তাকওয়ার মাধ্যমেই আল্লাহর রহমত লাভ করা সম্ভব। যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে এবং তাঁর বিধান মেনে চলে, আল্লাহ তার প্রতি রহমত বর্ষণ করেন এবং তাকে পার্থিব ও পারলৌকিক উভয় জগতের কল্যাণ দান করেন। সুতরাং মুমিনদের উচিত পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ পরিহার করে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সুদৃঢ় করা, কারণ এর মাধ্যমেই সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং আল্লাহর রহমত নাজিল হয়।
শিক্ষা ও উপদেশ:
ইসলাম ধর্মে সব মুমিন এক পরিবারের সদস্য। জাতি, ভাষা, বর্ণ বা ভৌগোলিক সীমানা নির্বিশেষে ঈমানদাররা পরস্পর ভাই। এই ভ্রাতৃত্বের বন্ধন অটুট রাখা প্রত্যেক মুমিনের দায়িত্ব।
মুমিনদের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব বা কলহ দেখা দিলে তা দ্রুত মীমাংসা করা অপরিহার্য। নীরব থাকা বা ঝগড়া উসকে দেওয়া কখনো কাম্য নয়। বরং সৎ ও ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিদের এগিয়ে এসে শান্তি স্থাপনের চেষ্টা করা উচিত।
তাকওয়া বা আল্লাহভীতি মানুষের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা আনে। যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, সে অন্যায়, হিংসা ও বিদ্বেষ থেকে দূরে থাকে এবং সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হয়।
আল্লাহর রহমত লাভের অন্যতম মাধ্যম হলো মুমিনদের মধ্যে সম্প্রীতি স্থাপন করা এবং তাকওয়া অবলম্বন করা। যারা এ কাজ করে, তারা আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহের অধিকারী হয়।
এই আয়াত আমাদের শেখায় যে, ইসলামে পারস্পরিক ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও ঐক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ঐক্য বজায় রাখলে উম্মাহ শক্তিশালী হয় এবং আল্লাহর সাহায্য লাভ করে।
যদি মুমিনদের দুই দল যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়ে, তবে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দিবে। অতঃপর যদি তাদের একদল অপর দলের উপর চড়াও হয়, তবে তোমরা আক্রমণকারী দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে; যে পর্যন্ত না তারা আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে। যদি ফিরে আসে, তবে তোমরা তাদের মধ্যে ন্যায়ানুগ পন্থায় মীমাংসা করে দিবে এবং ইনছাফ করবে। নিশ্চয় আল্লাহ ইনছাফকারীদেরকে পছন্দ করেন।
মুমিনগণ, কেউ যেন অপর কাউকে উপহাস না করে। কেননা, সে উপহাসকারী অপেক্ষা উত্তম হতে পারে এবং কোন নারী অপর নারীকেও যেন উপহাস না করে। কেননা, সে উপহাসকারিণী অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ হতে পারে। তোমরা একে অপরের প্রতি দোষারোপ করো না এবং একে অপরকে মন্দ নামে ডেকো না। কেউ বিশ্বাস স্থাপন করলে তাদের মন্দ নামে ডাকা গোনাহ। যারা এহেন কাজ থেকে তওবা না করে তারাই যালেম।
মুমিনগণ, তোমরা অনেক ধারণা থেকে বেঁচে থাক। নিশ্চয় কতক ধারণা গোনাহ। এবং গোপনীয় বিষয় সন্ধান করো না। তোমাদের কেউ যেন কারও পশ্চাতে নিন্দা না করে। তোমাদের কেউ কি তারা মৃত ভ্রাতার মাংস ভক্ষণ করা পছন্দ করবে? বস্তুতঃ তোমরা তো একে ঘৃণাই কর। আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।
সূরাকুরআন ওয়েবসাইট প্রতিষ্ঠিত হয়েছে পবিত্র কিতাব ও পবিত্র সুন্নাহর সেবা, আল্লাহর দিকে দাওয়াত এবং কুরআন-সুন্নাহর মানহাজে দ্বীনি ইলম সহজলভ্য করার একটি বিনম্র প্রচেষ্টা হিসেবে। আমরা আল্লাহর প্রশংসা করি ও তাঁর অনুগ্রহের জন্য কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করি, এবং তাঁর কাছে প্রার্থনা করি যেন তিনি আমাদের কাজ কবুল করেন এবং তা একমাত্র তাঁর সন্তুষ্টির জন্য নিষ্ঠাপূর্ণ করেন।