আর তোমরা স্ত্রীদেরকে তাদের মোহর দিয়ে দাও খুশীমনে। তারা যদি খুশী হয়ে তা থেকে অংশ ছেড়ে দেয়, তবে তা তোমরা স্বাচ্ছন্দ্যে ভোগ কর।
📜
অনুবাদ — Tafsir
শব্দার্থ:
صَدُقَاتِهِنَّ (সাদুকাতিহিন্না): তাদের মোহরসমূহ। 'সাদুকা' শব্দটি 'সিদাক'-এর বহুবচন, যার অর্থ মোহর বা বিবাহের সময় স্ত্রীকে প্রদেয় অর্থ/সম্পদ।
نِحْلَةً (নিহলাহ): উপঢৌকনস্বরূপ, খুশি মনে ও বাধ্যতামূলকভাবে প্রদত্ত দান।
طِبْنَ (ত্বিবনা): তারা সন্তুষ্টচিত্তে দান করে।
نَفْسًا (নাফসান): এখানে 'নাফস' শব্দটি 'ত্বিব'-এর সাথে তাময়িজ হিসেবে এসেছে, অর্থাৎ অন্তর থেকে সন্তুষ্ট হয়ে।
هَنِيئًا (হানিআন): যা খাওয়ায় কোনো কষ্ট বা ঝামেলা নেই, সম্পূর্ণ আরামদায়ক।
مَرِيئًا (মারিআন): যা গলাধঃকরণে সহজ, স্বাদে ও পরিণতিতে সুখকর, কোনো অস্বস্তি বা পরবর্তী কষ্ট নেই।
তাফসির:
আল্লাহ তাআলা মুমিন পুরুষদের নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তারা যেন নারীদের (স্ত্রীদের) মোহর সম্পূর্ণরূপে প্রদান করে, এবং তা যেন হয় নিহলাহ তথা খুশি মনে, স্বতঃস্ফূর্তভাবে ও বাধ্যতামূলকভাবে—এটি কোনো ঋণ বা ধার নয়, বরং একটি উপঢৌকন ও অধিকার যা স্ত্রীর সম্পূর্ণ মালিকানায় যায়। মোহর আদায় করা স্বামীর জন্য ফরজ এবং স্ত্রীর জন্য এটি বৈধ সম্পদ; এতে কারো কোনো হস্তক্ষেপ বা আপত্তির সুযোগ নেই।
এরপর আল্লাহ বলেন: যদি স্ত্রীরা নিজেদের ইচ্ছায় ও পূর্ণ সন্তুষ্টচিত্তে (কোনো প্রকার চাপ, ভয় বা প্রতারণা ছাড়া) মোহরের কোনো অংশ স্বামীকে মাফ করে দেয় বা দান করে, তবে তা গ্রহণ করা স্বামীর জন্য সম্পূর্ণ হালাল, পবিত্র ও বরকতময়। এতে কোনো প্রকার গুনাহ, সংকীর্ণতা বা পরবর্তী অনুশোচনার ভয় নেই। তবে শর্ত হলো, এই দান হতে হবে স্ত্রীর পূর্ণ সন্তুষ্টি ও স্বাধীন ইচ্ছায়; জোর করে, ধমক দিয়ে বা কৌশলে আদায় করা সম্পূর্ণ হারাম।
শিক্ষা ও উপদেশ:
ইসলাম নারীর অর্থনৈতিক অধিকারকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে; মোহরকে সে অধিকারের একটি মৌলিক স্তম্ভ বানিয়েছে, যা তাকে সম্মান ও নিরাপত্তা দেয়।
মোহর আদায়ে স্বামীর বিলম্ব বা কার্পণ্য করা অন্যায়; বরং তা খুশি মনে ও সময়মতো প্রদান করাই ঈমানের দাবি।
স্ত্রীর সম্পদে স্বামীর কোনো স্বয়ংক্রিয় অধিকার নেই; কেবল তার সন্তুষ্টি ও দানই তা হালাল করতে পারে। এটি পারিবারিক সম্পর্কের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার ভিত্তি রচনা করে।
এই নির্দেশনার মাধ্যমে ইসলাম নারীকে আর্থিকভাবে স্বাধীন ও সম্মানিত করেছে, যা তাকে সমাজে শক্ত অবস্থান দেয় এবং তাকে পুরুষের অনুগ্রহপ্রাপ্ত নয়, বরং অধিকারপ্রাপ্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
হালাল উপার্জন ও হালাল গ্রহণে বরকত থাকে; আর হারাম বা জুলুমের মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ কখনো সুখ ও শান্তি আনে না। এই আয়াত মুমিনকে পবিত্র ও সন্তুষ্টিমূলক জীবনযাপনের শিক্ষা দেয়।
এতীমদেরকে তাদের সম্পদ বুঝিয়ে দাও। খারাপ মালামালের সাথে ভালো মালামালের অদল-বদল করো না। আর তাদের ধন-সম্পদ নিজেদের ধন-সম্পদের সাথে সংমিশ্রিত করে তা গ্রাস করো না। নিশ্চয় এটা বড়ই মন্দ কাজ।
আর যদি তোমরা ভয় কর যে, এতীম মেয়েদের হক যথাথভাবে পুরণ করতে পারবে না, তবে সেসব মেয়েদের মধ্যে থেকে যাদের ভাল লাগে তাদের বিয়ে করে নাও দুই, তিন, কিংবা চারটি পর্যন্ত। আর যদি এরূপ আশঙ্কা কর যে, তাদের মধ্যে ন্যায় সঙ্গত আচরণ বজায় রাখতে পারবে না, তবে, একটিই অথবা তোমাদের অধিকারভুক্ত দাসীদেরকে; এতেই পক্ষপাতিত্বে জড়িত না হওয়ার অধিকতর সম্ভাবনা।
আর যে সম্পদকে আল্লাহ তোমাদের জীবন-যাত্রার অবলম্বন করেছেন, তা অর্বাচীনদের হাতে তুলে দিও না। বরং তা থেকে তাদেরকে খাওয়াও, পরাও এবং তাদেরকে সান্তনার বানী শোনাও।
আর এতীমদের প্রতি বিশেষভাবে নজর রাখবে, যে পর্যন্ত না তারা বিয়ের বয়সে পৌঁছে। যদি তাদের মধ্যে বুদ্ধি-বিবেচনার উন্মেষ আঁচ করতে পার, তবে তাদের সম্পদ তাদের হাতে অর্পন করতে পার। এতীমের মাল প্রয়োজনাতিরিক্ত খরচ করো না বা তারা বড় হয়ে যাবে মনে করে তাড়াতাড়ি খেয়ে ফেলো না। যারা স্বচ্ছল তারা অবশ্যই এতীমের মাল খরচ করা থেকে বিরত থাকবে। আর যে অভাবগ্রস্ত সে সঙ্গত পরিমাণ খেতে পারে। যখন তাদের হাতে তাদের সম্পদ প্রত্যার্পণ কর, তখন সাক্ষী রাখবে। অবশ্য আল্লাহই হিসাব নেয়ার ব্যাপারে যথেষ্ট।
সূরাকুরআন ওয়েবসাইট প্রতিষ্ঠিত হয়েছে পবিত্র কিতাব ও পবিত্র সুন্নাহর সেবা, আল্লাহর দিকে দাওয়াত এবং কুরআন-সুন্নাহর মানহাজে দ্বীনি ইলম সহজলভ্য করার একটি বিনম্র প্রচেষ্টা হিসেবে। আমরা আল্লাহর প্রশংসা করি ও তাঁর অনুগ্রহের জন্য কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করি, এবং তাঁর কাছে প্রার্থনা করি যেন তিনি আমাদের কাজ কবুল করেন এবং তা একমাত্র তাঁর সন্তুষ্টির জন্য নিষ্ঠাপূর্ণ করেন।