মূসা বলল, যারা হিসাব দিবসে বিশ্বাস করে না এমন প্রত্যেক অহংকারী থেকে আমি আমার ও তোমাদের পালনকর্তার আশ্রয় নিয়ে নিয়েছি।
📜
অনুবাদ — Tafsir
শব্দার্থ:
عُذْتُ – আমি আশ্রয় নিয়েছি, আমি পানাহ চেয়েছি।
مُتَكَبِّرٍ – যে অহংকার করে, যে নিজেকে বড় মনে করে এবং সত্য মেনে নিতে অস্বীকার করে।
لَا يُؤْمِنُ بِيَوْمِ الْحِسَابِ – যে বিচার দিবসে বিশ্বাস করে না।
তাফসীর:
মূসা (আলাইহিস সালাম) যখন ফিরআউনের হুমকি ও ধমক শুনলেন—ফিরআউন বলেছিল, “আমি তোমাকে হত্যা করব” (সূরা গাফির: ২৬)—তখন তিনি কোনো ভয় বা আতঙ্ক প্রকাশ না করে পরম প্রশান্তির সাথে ঘোষণা করলেন: “আমি আমার রব এবং তোমাদের রবের কাছে আশ্রয় নিয়েছি।” অর্থাৎ, তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন যে, ফিরআউনের শক্তি, সৈন্য-সামন্ত বা হুমকির ভয়ে তিনি মোটেও বিচলিত নন। কারণ তিনি এমন এক সত্তার ওপর ভরসা করেছেন যিনি সবকিছুর মালিক, যিনি মূসারও রব এবং ফিরআউনেরও রব। তিনি সেই প্রত্যেক অহংকারী ব্যক্তির অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চেয়েছেন, যে সত্যকে মেনে নিতে অহংকার করে, যে আল্লাহর একত্ব ও আনুগত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং যে বিচার দিবসে বিশ্বাস করে না—যে দিন আল্লাহ তাঁর বান্দাদের সব কাজের হিসাব নেবেন।
মূসা (আ.) এখানে শুধু নিজের জন্য নয়, বরং ফিরআউনকেও সম্বোধন করে বলেছেন, “তোমাদের রব”—এতে তিনি ফিরআউনকে মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, আল্লাহ শুধু আমার রব নন, তোমারও রব। তিনি তোমাকেও সৃষ্টি করেছেন, তোমাকেও পালন করেন। তাই তোমার অহংকার ও সত্য প্রত্যাখ্যানের পরিণাম থেকে আমাকে রক্ষা করা তাঁর জন্য অতি সহজ। এটি ছিল ঈমানদারের সেই দৃঢ়তা ও সাহসের অনন্য উদাহরণ, যা আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা থেকে জন্ম নেয়।
শিক্ষা ও উপদেশ:
বিপদ-সংকটে মুমিনের প্রথম আশ্রয় হলো আল্লাহ। মূসা (আ.) যখন প্রাণনাশের হুমকির সম্মুখীন হলেন, তখন তিনি মানুষের কাছে সাহায্য চাননি, বরং সরাসরি আল্লাহর কাছে পানাহ চেয়েছেন। আমাদের উচিত যেকোনো বিপদে প্রথমে আল্লাহর দিকেই ধাবিত হওয়া।
অহংকার ও সত্য প্রত্যাখ্যান—এই দুটি গুণই মানুষের ধ্বংসের মূল কারণ। ফিরআউনের মতো ক্ষমতাধর ব্যক্তিও অহংকারের কারণে ধ্বংস হয়েছে। তাই আমাদের উচিত বিনয়ী হওয়া এবং সত্যকে মেনে নেওয়ার জন্য সর্বদা প্রস্তুত থাকা।
বিচার দিবসে বিশ্বাস মানুষের জীবনকে অর্থবহ করে তোলে। যে ব্যক্তি জানবে তার প্রতিটি কাজের হিসাব হবে, সে কখনো অন্যায়, অত্যাচার বা অহংকার করতে সাহস পাবে না। এই বিশ্বাসই মানুষকে সৎকর্মে উদ্বুদ্ধ করে এবং অন্যায় থেকে বিরত রাখে।
আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা থাকলে মানুষের ভয় দূর হয়ে যায়। মূসা (আ.) একা ছিলেন, কিন্তু আল্লাহর ওপর ভরসার কারণে তিনি ফিরআউনের বিশাল সাম্রাজ্যকে তুচ্ছ জ্ঞান করেছিলেন। আমাদেরও উচিত আল্লাহর ওপর দৃঢ় ভরসা রাখা, কারণ তিনিই সবচেয়ে শক্তিশালী অভিভাবক।
অতঃপর মূসা যখন আমার কাছ থেকে সত্যসহ তাদের কাছে পৌঁছাল; তখন তারা বলল, যারা তার সঙ্গী হয়ে বিশ্বাস স্থাপন করেছে, তাদের পুত্র সন্তানদেরকে হত্যা কর, আর তাদের নারীদেরকে জীবিত রাখ। কাফেরদের চক্রান্ত ব্যর্থই হয়েছে।
ফেরাউন বলল; তোমরা আমাকে ছাড়, মূসাকে হত্যা করতে দাও, ডাকুক সে তার পালনকর্তাকে! আমি আশংকা করি যে, সে তোমাদের ধর্ম পরিবর্তন করে দেবে অথবা সে দেশময় বিপর্যয় সৃষ্টি করবে।
ফেরাউন গোত্রের এক মুমিন ব্যক্তি, যে তার ঈমান গোপন রাখত, সে বলল, তোমরা কি একজনকে এজন্যে হত্যা করবে যে, সে বলে, আমার পালনকর্তা আল্লাহ, অথচ সে তোমাদের পালনকর্তার নিকট থেকে স্পষ্ট প্রমাণসহ তোমাদের নিকট আগমন করেছে? যদি সে মিথ্যাবাদী হয়, তবে তার মিথ্যাবাদিতা তার উপরই চাপবে, আর যদি সে সত্যবাদী হয়, তবে সে যে শাস্তির কথা বলছে, তার কিছু না কিছু তোমাদের উপর পড়বেই। নিশ্চয় আল্লাহ সীমালংঘনকারী, মিথ্যাবাদীকে পথ প্রদর্শন করেন না।
হে আমার কওম, আজ এদেশে তোমাদেরই রাজত্ব, দেশময় তোমরাই বিচরণ করছ; কিন্তু আমাদের আল্লাহর শাস্তি এসে গেলে কে আমাদেরকে সাহায্য করবে? ফেরাউন বলল, আমি যা বুঝি, তোমাদেরকে তাই বোঝাই, আর আমি তোমাদেরকে মঙ্গলের পথই দেখাই।
সূরাকুরআন ওয়েবসাইট প্রতিষ্ঠিত হয়েছে পবিত্র কিতাব ও পবিত্র সুন্নাহর সেবা, আল্লাহর দিকে দাওয়াত এবং কুরআন-সুন্নাহর মানহাজে দ্বীনি ইলম সহজলভ্য করার একটি বিনম্র প্রচেষ্টা হিসেবে। আমরা আল্লাহর প্রশংসা করি ও তাঁর অনুগ্রহের জন্য কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করি, এবং তাঁর কাছে প্রার্থনা করি যেন তিনি আমাদের কাজ কবুল করেন এবং তা একমাত্র তাঁর সন্তুষ্টির জন্য নিষ্ঠাপূর্ণ করেন।